প্রাচীন জ্যোতির্বিদ – Ancient Astronomer

প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিদ

খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৩০০ বছর পর্যন্ত গ্রীক সভ্যতা জ্যোতির্বিদ্যায় অনেক উন্নতি করে। এই সময়টাতে জ্যোতির্বিদ ছাড়াও আরো অনেক ধরনের বিজ্ঞানীরা ছিলেন যারা বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা নিয়েও গবেষণা করেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছে-

i. মিলেতুসের থেলিস (Thales)

থেলিস সবার প্রথম মহাকাশের ঘটনাগুলোকে গানিতিক এবং বিজ্ঞানের রূপ দেন। আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি সমুদ্রে জাহাজের দুরত্ব মাপতে পারতেন।

ii. সামোসের পিথাগোরাস (Pythagoras)

পিথাগোরাস ছিলেন গণিতের অন্ধভক্ত এবং গণিতের ধর্মগুরু। তিনি বলতেন মহাকাশের গ্রহ-উপগ্রহ গুলো বৃত্তাকার পথে চলে। তবে তার একটা ধারনা ভুল ছিলো। তিনি মনে করতেন কোনো রকম পরিক্ষা কিংবা এক্সপেরিমেন্ট ছাড়াই শুধুমাত্র শান্ত মনে চিন্তা করলেই বিজ্ঞানের সব জটিল রহস্য ভেদ হয়ে যাবে।

iii. ফিলোলাউস (Philolaus)

ফিলোলাউস ছিলেন পিথাগোরাসের শিষ্য। তিনিই প্রথম বলেন পৃথিবী বা সূর্য মহাবিশ্বের কেন্দ্র না। তার ধারনা ছিলো মহাবিশ্বের কেন্দ্র হচ্ছে বিশাল একটা অগ্নিকুণ্ড। সূর্য সেই অগ্নিকুণ্ড থেকে আলো নেয় এবং আমাদেরকে সেটা দান করে।

iv. প্লেটো (Plato)

প্লেটো পিথাগোরাসের মতই মনে করতেন ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলেই বিজ্ঞানের সব রহস্য ভেদ হয়ে যাবে। তিনি পর্যবেক্ষণ নির্ভর ছিলেন না।

v. এরিস্টটল (Aristotle)

এরিস্টটলের শিক্ষক ছিলো প্লেটো। তবে এরিস্টটল প্লেটোর বিরোধী ছিলেন। এরিস্টটল বিজ্ঞানকে পরিক্ষা-নিরিক্ষা করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি খেয়াল করতেন সমুদ্রে কোনো জাহাজ যদি অনেক দূরে চলে যায় তবে জাহাজের উঁচু অংশ সবার পরে অদৃশ্য হয়ে যায়। তিনি প্রথম পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু তার এই চিন্তা এখন ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

 

প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার জ্যোতির্বিদ

মিশরের একটা ছোট্ট শহরের নাম আলেকজান্দ্রিয়া। ৩৩২ খ্রিস্টপূর্ব সময় সম্রাট আলেকজান্ডার মিশর দখল করে নিয়েছিলো। মিশরের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলো না বলে মিশরবাসী তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়। মিশরের শহরগুলো তখন অনেক সুন্দর ছিলো। শহরের সুন্দর রূপ দেখে আলেকজান্ডার অনেক আনন্দিত হয়ে ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ উপকূলে একটা শহর তৈরি করেন যার নাম তিনি দিয়েছিলেন আলেকজান্দ্রিয়া।

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর আলেকজান্দ্রিয়া শহরের শাসক হয় সেনাপতি টলেমি। টলেমির শাসনামল ছিলো প্রায় ৩০০ বছরের মত। এই সময়টায় আলেকজান্দ্রিয়া শহর ছিলো বিশ্বের অন্যতম স্বর্গীয় এবং জ্ঞানের শহর। তখনকার সময়ের বিখ্যাত লাইব্রেরি এই শহরটায় তৈরি করা হয় যেটা আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি নামে পরিচিত। এই লাইব্রেরিতে প্রায় ১০ লাখের মত হাতে লেখা বই ছিলো। বইগুলো তখন লেখা হতো প্যাপিয়াসের পাতায়।

আলেকজান্দ্রিয়া শহরে অনেক জ্যোতির্বিদদের বসবাস ছিলো। তাদের বইও এই লাইব্রেরিতে পাওয়া যেতো। এমনি কিছু বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ হচ্ছেন-

i. এরিস্টার্কাস (Aristarchus)

এরিস্টার্কাস তার লেখা বইতে লিখেছিলেন সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড়। সূর্যগ্রহণের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি এটা বুঝতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সূর্যের চারপাশে পৃথিবী ঘোরে। এছাড়া তিনি বের করেন আকাশের তারা গুলো আমাদের পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে।

 

ii. এরাটোস্থেনিস (Eratosthenes)

এরাটোস্থেনিস ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরির গ্রন্থাগার। অবসর সময় লাইব্রেরিতে বসে তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন। একটা বইতে তিনি বিষ্ময়কর তথ্য পান। সেটি হলো মিশরের সিরিন নামক শহরে ঠিক দুপুর ১২ টায় সূর্যের আলোয় কোনো বস্তুর ছায়া পড়ে না, কিন্তু একই সময় আলেকজান্দ্রিয়া শহরে যেকোনো বস্তুর ছায়া পড়ে তখন। এই ধারনা থেকে তিনি জ্যামিতি ব্যবহার করে স্টেডিয়া পরিমাপের পদ্ধতি প্রয়োগ করে পুরো পৃথিবীর পরিধি নির্ভুলভাবে নির্ণয় করার চেষ্টা করেন। এছাড়া তিনি সূর্য থেকে পৃথিবীর দুরত্ব বের করার চেষ্টা করেন। এছাড়া তিনিই প্রথম দ্রাঘিমারেখা ও অক্ষরেখা বিশিষ্ট তৎকালীন বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কন করেন। এরাটোস্থেনিস প্রথম “Geography” শব্দটি ব্যবহার করেন, তাই তাকে ভূগোল বা Geography-র জনক বলা হয়।

iii. এপোলনিয়াস (Apollonius)

তিনি সর্বপ্রথম উপবৃত্ত, পরাবৃত্ত এবং অধিবৃত্তের ধারনা দেন।

iv. হিপ্পার্কাস (Hipparchus)

আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে বই পড়ার পাশাপাশি অনেকে গবেষণার কাজও করতো তখনকার সময়। হিপ্পার্কাস এই লাইব্রেরিতে দিনরাত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতেন। তাকে প্রাচীন যুগের সেরা জ্যোতির্বিদ বলা হয়। আকাশের তারা গুলোকে আপাত উজ্জ্বলতার ভিত্তিতে বিভিন্ন মান দিয়েছিলেন তিনি। সূর্যগ্রহণের নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যৎবাণী তিনিই প্রথম করেছিলেন। ইউরোপে প্রথম তারাদের লিস্ট তৈরি করেন তিনি।

হিপ্পার্কাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি হলো তিনি পৃথিবী যে অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘোরে সেই অক্ষের ঘোরার পথ নির্ণয় করেন। সেই অক্ষটি এই পুরো পথকে ঘুরে আসতে মোট ২৬ হাজার বছর সময় নেয়।

হিপ্পার্কাসের পরে মিশরে আর ভালো কোনো জ্যোতির্বিদ আসেনি। ৪৮ খ্রিস্টপূর্ব সময় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার মিশরকে দখল করতে আসার সময় পুরো মিশররে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই আগুনে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির বড় অংশ পোড়া যায়। তবে যেসব বই পোড়া যায়নি সেগুলো দিয়ে অন্য একটা ছোট লাইব্রেরি বানানো হয়েছিলো তখন।

এসব ঘটনার অনেকদিন পর খ্রিস্টের জন্মের ৯০ বছর পরে আলেকজান্দ্রিয়াতে জন্ম নেন আরেক বিজ্ঞানী টলেমি।

v. টলেমি (Ptolemy)

টলেমি ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। কিন্তু তার কিছু গবেষণা অত্যন্ত ভুল ছিলো যার কারনে কয়েকশ বছর বিজ্ঞান ছিলো অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে। তিনি একটা বিখ্যাত বই লিখেছিলন, সেটার নাম ছিলো আলমাজেস্ট। বইতে তিনি এরিস্টটলের পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন। অর্থাৎ পুরো মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে পৃথিবীকে ধরেন তিনি। তখন থেকে কয়েকশ বছর পর পর্যন্ত তার এই মতবাদকে সবাই নির্বিশেষে গ্রহণ করে। তিনি চাঁদ-সূর্য-তারা এদের অতীত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে জানার চেষ্টা করেন। তিনি এই মহাবিশ্বের বিশাল মডেল তৈরি করেন। তিনি ধারনা করেন পৃথিবী থেকে সূর্যের দুরত্ব পৃথিবীর ব্যাসের ১২১০ গুন এবং পৃথিবী থেকে অন্যান্য তারকাদের দুরত্ব পৃথিবীর ব্যাসের ২০০০০ গুন।

vi. হাইপেশিয়া (Hypatia)

হাইপেশিয়া ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী জ্যোতির্বিদ বা Astronomer. তিনি ৩৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন আলেকজান্দ্রিয়াতে। তিনি ছিলেন তখনকার সময়ের বিখ্যাত গনিতবিদ। তিনি এপোলনিয়াসের গনিত নিয়ে গবেষণার উপর বই লিখেন। টলেমির Astronomy নিয়ে করা কাজগুলোর উপর তিনি রিসার্চ করেন। তিনি তখন প্রতি হপ্তায় বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন বক্তৃতা দিতেন। তার এসব লেকচার শোনার জন্য রোম, এথেন্স এসব শহর থেকে মানুষ আলেকজান্দ্রিয়াতে আসতো। তিনি প্রথম হাইড্রোমিটার তৈরি করেন যা দিয়ে তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুপ্ত মাপা যেতো। এছাড়া তিনি আকাশে সূর্য এবং নক্ষত্রের অবস্থান জানার জন্য Astrolabe নামক যন্ত্র আবিষ্কার করেন।

হাইপেশিয়ার বিজ্ঞান চর্চাকে তখনকার সময়ের কিছু মানুষ ভালো মনে করতো না। কারন তথাকথিত কিছু খ্রিস্টান যাজক এবং শাসকেরা মনে করতো তার বিজ্ঞান চর্চা তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। তাই তাকে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপের আদেশে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ৪১৫ সালের এক সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অথিতি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

Emtiaz Khan

Emtiaz Khan is a person who believes in simplicity. He encourages the people for smart education. He loves to write, research about new information. Currently he is studying at the department of EEE.