প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা – Ancient Astronomy

প্রাচীন মিশরের জ্যোতির্বিদ্যা

প্রাচীনকালে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ বছর আগে মিশরের সভ্যতা গড়ে উঠে। মিশরের কৃষকেরা নীল নদের পানি দিয়ে কৃষিকাজ করতো। প্রতি বছর তাদের এলাকাগুলোতে বন্যা হতো এবং বন্যার পানিতে ফসল নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকতো। তাই বন্যা চলাকালীন তারা কোনো চাষাবাদ করতো না। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর তারা চাষাবাস করতো। তারা লক্ষ করতো সকালের পূর্ব আকাশে যখন Sirius নামক নক্ষত্রটি অনেক উজ্জ্বল হয়ে উঠে তার কিছুদিন পরেই বন্যা শুরু হয়। মিশরের এসব লোকগুলোই প্রথম আকাশের তারা নিয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করে।

মিশরীয়রা পিরামিড বানানের জন্য বিখ্যাত এবং এসব পিরামিডগুলো ছিলো জ্যোতির্বিদ্যার নিদর্শন। পৃথিবী একটা নির্দিষ্ট অক্ষের সাপেক্ষে ঘোরে। এই অক্ষকে উত্তর দিকে বাড়ালে সেটা আকাশের তলকে স্পর্শ করে। এই বিন্দুকে সুমেরু বলে। পিরামিডের সুচালো মাথাগুলো এই সুমেরু বরাবর থাকে।

এছাড়া তারা প্রতিদিনের সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তকে লক্ষ করতো। ঝড়বৃষ্টি, চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ লক্ষ করতো। আকাশের তারা দেখে পরিক্ষা করতো কোন তারা কোন দিকে সবসময় উঠে। তাই এসব লোকেরা আকাশের তারাকে নির্ভরতার প্রতীক বানিয়েছিলো। আকাশের গ্রহ-উপগ্রহকে স্বর্গের দেবতা বানিয়েছিলো। তাদের বিশ্বাস ছিলো আমাদের জীবন-মরণ, ভাগ্য-নিয়তি এসব নিয়ন্ত্রণ করছে এসব গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্র।

তবে দুঃখের কথা হচ্ছে মিশরীয়দের এসব Astronomy চর্চা আমাদের বর্তমান যুগের Astronomy চর্চার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে নি।

প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা

ভারতে প্রাচীনযুগে চন্দ্র এবং সূর্যের গতিবিধি লক্ষ করা হতো বলে জানা যায়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ার উপর ভিত্তি করে ঋতু পরিবর্তন ও বছরের হিসাব বের করা হতো। পূর্ণিমা এবং অমাবস্যা দ্বারা বছরকে মাসে ভাগ করা হতো।

হিন্দু ধর্মের প্রায় প্রতিটা রীতিনীতিতে গ্রহ-উপগ্রহ এবং নক্ষত্রের কথা জড়িয়ে থাকতো। তাই প্রাচীন ভারতে Astronomy কে Astrology বা জোতিষবিদ্যা হিসেবে চালু করে কিছু মানুষ যাদেরকে জোতিষী বলা হত। তারা গ্রহ-নক্ষত্র ব্যবহার করে মানুষের ভবিষ্যতবাণী করতো। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে প্রাচীন ভারতে পৃথিবী থেকে চাঁদের দুরত্ব হিসাব করা হয় এবং মোটামুটি বাস্তব মানের কাছাকাছি মান পাওয়া যায় সেখান থেকে।

প্রাচীন চীনদেশের জ্যোতির্বিদ্যা

চীন দেশে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর থেকে জ্যোতির্বিদ্যা বা Astronomy নিয়ে গবেষণা শুরু করে। তখন আকাশের তারা গুলোর গতিবিধি লক্ষ করে লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো। এছাড়া তারা আকাশের জন্য তাদের রেফারেন্স পয়েন্ট হিসাবে বৃত্তাকার নক্ষত্র ব্যবহার করতো। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে সেখানে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হতো।

তখনকার সময় চীনা জ্যোতির্বিদদের কাজ ছিলো প্রতিটা মাসের প্রথম দিন ঘোষণা করা, দিনপঞ্জির সময় তালিকা তৈরি করা। যদি তারা এসব কাজে ভুল করতো তবে তাদের শাস্তি দেয়া হতো। একটা কাহিনী প্রচলিত আছে। তখনকার সময় “হি” এবং “হো” নামক দুজন জ্যোতির্বিদ সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয়ের তারিখ ভুল করায় তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয় একজন শাসক।

সময় বের করার জন্য তখনকার জ্যোতির্বিদরা পুরো আকাশকে ১২টা ভাগে ভাগ করেন। চন্দ্রগ্রহণের সঠিক সময় খুঁজে বের করা,  প্রায় ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বে চীন দেশের এক বিজ্ঞানী সি সেন (Shi-Shen) ৮০০ টির মত নক্ষত্র নিয়ে বিশাল লিস্ট তৈরি করেন। তার তৈরি এই তালিকাটি ছিলো প্রাচীনতম বৃহৎ নক্ষত্রপঞ্জি। তিনিই বৃত্তকে ৩৬৫ টি ভাগে ভাগ করেন কারন একটা বছরে ৩৬৫ টি দিন থাকে। চীনদেশে বছরের ছোট দিনে সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করা হয়, সূর্যগ্রহণের সঠিক সময় নির্ণয় করা হয়, খালি চোখে সূর্যের উপরিভাগের কালো দাগ বা Sun Spot কে সনাক্ত করা হয়। এছাড়া ৭০০ খ্রিস্টপূর্বে চীনে ধূমকেতু এবং উল্কা পতনের একটা তালিকা তৈরি করা হয়।

চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ গুলোর মধ্যে একটি ছিল 1054 খ্রিস্টাব্দে আকাশে সুপারনোভা দেখা।

প্রাচীন ব্যাবিলনের জ্যোতির্বিদ্যা

বর্তমান সময় ইরাক দেশ যে জায়গাটায় অবস্থিত সেখানে একসময় ব্যাবিলন নামক এক সভ্যতা ছিলো। ২০০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্ব সময় পর্যন্ত ব্যাবিলনীয় সভ্যতা অনেক উন্নত একটা সভ্যতা ছিলো। তারা প্রথম পৃথিবীর একটা ম্যাপ তৈরি করেছিলো। সেই ম্যাপ অনুযায়ী পৃথিবী ছিলো পাহাড়ের মত উঁচু। পৃথিবীর চারপাশে ছিলো সমুদ্রের পানি। পানির চারপাশে ছিলো পাহাড়ের বলয় যেটা স্বর্গকে ধরে রেখেছে। স্বর্গ ছিলো পৃথিবীর উপরে, আকাশের দিকে। আকাশের মধ্যে স্বর্গের স্তর ছিলো তিনটি। তিন স্তরের স্বর্গের শেষে ছিলো স্বর্গীয় সমুদ্র। এই সমুদ্রের শেষে কি ছিলো সেটা নিয়ে কিছু বলেনি তারা। তাদের ম্যাপ অনুসারে পৃথিবীর নিচের দিকে ছিলো নরক। এই নরক সাতটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিলো বলে তারা মনে করতো।

ব্যাবিলনরা চন্দ্র এবং সূর্যের গতিবিধি গুলো খুব সুন্দরভাবে বুঝতে পারতো এবং সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণ নিয়ে সঠিক ভবিষ্যৎবাণী করতে পারতো। তারা জ্যামিতি এবং মাপজোকের ব্যাপারগুলো অনেক ভালো বুঝতো। তারা নিখুঁতভাবে চন্দ্রগ্রহণের আবর্তনকাল আবিষ্কার করে। তারা বের করে ১৮ বছর পর পর চন্দ্রগ্রহণ একই সময় ঘটে। এই ঘটনাকে Saros অথবা Chaldean Saros বলা হয়।

ব্যাবিলনরা ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে গণনা করতো, যেমন আমরা আজকের যুগে ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে গণনা করি। তাদের এই ভিত্তি থেকে ৬০ মিনিটে এক ঘন্টা, ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট এই ধারনা গুলো আসে।

ব্যাবিলনরা তখনকার সময়ে একটা ক্যালেন্ডার তৈরি করে যেটাতে বছর ছিলো ৩৬০ দিনের এবং বছরে মাস ছিলো ১২টি। তারা কয়েক বছর পর পর একটা মাস যোগ করে ১৩ মাসের বছর বানাতো। এভাবে তারা বছরের হিসাবকে সংশোধন করতো।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অথিতি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

Emtiaz Khan

A person who believes in simplicity. He encourages the people for smart education. He loves to write, design, teach & research about unknown information.

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published.