নক্ষত্রের জন্ম (Birth of Star)

আমাদের সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র, তেমনিভাবে রাতের আকাশে আমরা যাদেরকে তারা বা star হিসেবে চিনি তারাও একেকটি নক্ষত্র। প্রতিটা নক্ষত্র একেকজনের কাছ থেকে অনেক বেশি দুরত্বে অবস্থান করে। যেমন আমাদের সূর্যের সবচেয়ে কাছের সোলার সিস্টেম বা নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টরি। সূর্য থেকে এটির দুরত্ব প্রায় ৪ আলোকবর্ষ। এর মানে হচ্ছে আলোর গতিতে বা 3 x 10^8 m/s গতিতে যদি পৃথিবী থেকে কোনো রকেট যাত্রা শুরু করে তবে আলফা সেন্টরিতে যেতে ৪ বছর সময় লাগবে। ঠিক এরকমভাবে আমাদের ইউনিভার্সে প্রতিটা নক্ষত্রের মাঝে বিশাল দুরত্ব থাকে। এই বিশাল দুরত্বের মাঝে অনেক জায়গাই ফাঁকা থাকে। এই ফাঁকা জায়গাগুলো একটা নক্ষত্রের সৃষ্টি হবার জন্য দায়ী।

বিগ ব্যাং এর পর মহাবিশ্বে অনেক অনেক ধূলিকণা প্রতিনিয়ত ভেসে বেড়ায়। এই ধূলিকণা গুলোর মধ্যে কিছুটা হলেও মধ্যাকর্ষণ বল কাজ করতো। এসব ধূলিকণা গুলোকে আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণা বা Inter-stellar dusts বলে। এছাড়া মহাবিশ্বে তখন বিভিন্ন গ্যাসের বিশাল বিশাল মেঘ ভেসে বেড়াতো যাদেরকে cloud of gas বলা হয়। মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণা এবং বিশাল গ্যাসের মেঘ এরা একে অপরের কাছে আসার চেষ্টা করে এবং একটা নির্দিষ্ট জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবার চেষ্টা করে। ঠিক তখন এভাবেই নক্ষত্রের জন্ম শুরু হয়। যদিও আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণা এবং গ্যাসীয় মেঘ মহাকাশে বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত থাকে, তবুও তারা যখন মধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে একে অপরের সান্নিধ্যে আসে তখন তাদের মিলিত আকার ছোট হতে থাকে। কেননা সেখানে তখন বেশি পরিমাণ মহাকর্ষীয় বলের প্রভাব থাকে। এই মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবের ফলে তাদের মধ্যে যে সংকোচন ঘটে তাকে gravitational contraction বা মহাকর্ষীয় সংকোচন বলে।

যেহেতু অনেক পরিমান আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণা এবং গ্যাসীয় মেঘের বলের প্রভাবে খুব কম আয়তনের জায়গায় সংকুচিত হয় তাই সেখানে প্রচণ্ড চাপ এবং তাপমাত্রা তৈরি হয়। একই সাথে সেই জায়গাটিতে ধূলিকণা ও গ্যাসের আধিক্যের ফলে সেখানকার ঘনত্বও অনেক বেড়ে যায়। অনেক বেশি পরিমাণ গ্যাস এবং ধূলিকণার মহাকর্ষীয় সংকোচনের ফলে একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে তারা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। তখন সেই জায়গাটিতে তাদের তাপমাত্রা কয়েক মিলিয়ন কেলভিনে পৌঁছে যায়। এই বিশাল পরিমাণ তাপমাত্রার ফলে সেই জায়গাটিতে এক ধরনের বিক্রিয়া শুরু হয় যাকে তাপ নিউক্লিয় বিক্রিয়া বা thermo nuclear reaction বলে। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন গ্যাস প্রতিনিয়ত হিলিয়াম গ্যাসে পরিণত হয়।

যদি কোনো গ্যাসের তাপমাত্রা বাড়ে তখন গ্যাসের সম্প্রসারণ বেশি হতে থাকে। তাই এখন ধূলিকণা ও হাইড্রোজেন গ্যাসের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াতে তারা সম্প্রসারিত হবার চেষ্টা করব। কিন্তু তাদের পরিমান অনেক বেশি বলে তারা মহাকর্ষীয় বল দ্বারা পরস্পরকে আকর্ষণ করে থাকতে চাইবে। অর্থাৎ ধূলিকণা ও হাইড্রোজেন গ্যাসের গোলকের মধ্যে একটা পরস্পর বিপরীত ফোর্স কাজ করবে। একটা গ্যাভিটেশনাল ফোর্স এবং আরেকটা তাপ বৃদ্ধির ফলে সম্প্রসারিত হবার ফোর্স

এভাবে দুটো ফোর্স সাম্যবস্থায় থাকবে এবং বিশাল হাইড্রোজেনের মেঘ আকারে মহাশূণ্যে ভাসতে থাকবে। এই বিশাল হাইড্রোজেনের মেঘটাই হচ্ছে নক্ষত্র। আমাদের সূর্য সহ অন্যান্য নক্ষত্রও ঠিক একইভাবে তৈরি হয়েছে। তাহলে বলা যায়, নক্ষত্র হচ্ছে হাইড্রোজেন গ্যাসের মেঘ

খেয়াল করো, প্রতিটা নক্ষত্র সাম্যবস্থায় থাকে। এর ভেতরের গ্যাভিটি নক্ষত্রের গ্যাসগুলোকে ভেতরের দিকে টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করে এবং গ্যাসের তাপ গ্যাসকে বাইরের দিকে সম্প্রসারিত হবার জন্য ফোর্স করে।

আবার নক্ষত্রের ভেতরে প্রতিটা হাইড্রোজেন অনুগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘর্ষের ফলে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম পরমানু তৈরি হয়। অর্থাৎ হাইড্রোজেনের একটা প্রোটন থেকে একটা হিলিয়াম তৈরি হয় যার প্রোটন এবং নিউট্রন সংখ্যা থাকে দুটো করে। কিন্তু যে হিলিয়াম পরমানু তৈরি হয় তার নিউক্লিয়াসের ভরের হিসাব ঠিক থাকে না। দুটো প্রোটন এবং দুটো নিউট্রনের আলাদা আলাদা ভরের যোগফল করলে যে মান পাওয়া যায়, একটা হিলিয়াম পরমানুর নিউক্লিয়াসের ভরের মান তার চেয়েও কম থাকে। অর্থাৎ হিলিয়াম পরমানু তৈরি হবার সময় কিছু ভর হিলিয়াম পরমানু থেকে হারিয়ে যায়। এই হারানো ভর আইনস্টাইনের E = mc² সূত্রানুসারে বিপুল পরিমান শক্তি তৈরি করে এবং এই শক্তি প্রতিটা নক্ষত্র আলোক শক্তি হিসেবে মহাশূন্যে ছড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হবার সময় হিলিয়াম পরমানুর হারানো ভর যে শক্তিতে পরিনত হয় সেই শক্তি নক্ষত্র থেকে আলোকশক্তি আকারে নির্গত হয়। আলোর সাথে সাথে এই শক্তির মাধ্যমে তাপও নির্গত হওয়া শুরু করে। তাই আমাদের সূর্য হচ্ছে এক ধরনের নক্ষত্র যেটি তার মধ্যে ঘটা তাপ নিউক্লিয় বিক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদেরকে আলো এবং তাপ দুটোই দেয়। এভাবেই মহাকাশে একেকটা নক্ষত্র তৈরি হয়।

মনে রাখতে হবে, নক্ষত্রের জ্বালানি বা ফুয়েল হচ্ছে হাইড্রোজেন। এখন প্রশ্ন হলো কেনো শুধুমাত্র হাইড্রোজেন প্রতিটা নক্ষত্রের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে? অন্যান্য মৌলও তো কাজ করতে পারতো! এর কারণ হচ্ছে, বিগ ব্যাং সংগঠিত হবার পরে 3 মিনিট থেকে 20 মিনিট সময় পর্যন্ত একটা প্রসেস ঘটেছিল যার নাম Nuclosynthesis. এই প্রসেসে প্রোটন এবং নিউট্রন মিলে কিছু প্রাথমিক মৌল গঠন করে। একটা প্রোটন এবং একটা নিউট্রন খুব সহজেই যুক্ত হয়ে একটা হাইড্রোজেন পরমাণু গঠন করতে পারে। তাই এই সময়টিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তৈরি হয়েছিল হাইড্রোজেন পরমাণু। কারণ তাকে তৈরি করা একদম সোজা। তাই হাইড্রোজেন সবচেয়ে সরল পরমাণু যেটি বিগ ব্যাং এর পরে মহাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাই নক্ষত্রের মধ্যে জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন এর উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অতিথি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

Emtiaz Khan

A person who believes in simplicity. He encourages the people for smart education. He loves to write, design, teach & research about unknown information.