বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন : চর্যাপদ

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য বা কবিতা সংকলন। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হতো বিধায় এরা একই সাথে গান ও কবিতা। এই গান গুলোর মূল বিষয়বস্তু হলো বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় তত্ত্বকথা। বৌদ্ধ সহজিয়াগন চর্যাপদ রচনা করেন।

চর্যাপদ রচনা শুরু হয় পাল রাজবংশের শাসনামলে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। পরবর্তীতে সেন বংশের রাজারা (যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন) তারা পালদের বিতাড়িত করলে বৌদ্ধ সহজিয়াগন এই দেশ ত্যাগ করে নেপালে আশ্রয় নেয়। এই কারণে চর্যাপদ নেপাল থেকে আবিষ্কৃত হয়।

 

চর্যাপদ আবিষ্কার

১৮৮২ সালে রাজা রাজেন্দ্র লালমিন তার লেখা “Sansknit Buddhist Literature in Nepal” নামে একটি বই প্রকাশ করেন যে বইতে চর্যাপদ এর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই সূত্র ধরে প্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৯৭ এবং ১৮৯৮ সালে দুবার নেপালে অনুসন্ধান করেন। কিন্তু তিনি তার অনুসন্ধানে সফলতা লাভ করতে পারেন নি। পরবর্তীতে তিনি ১৯০৭ সালে পুনরায় নেপালে অনুসন্ধান করেন এবং “চর্যাচর্য বিনিশ্চয়” নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। একই সাথে আরও দুটি বই যথাক্রমে-

১. ডাকার্নব ও

২. দোহাকোষ (কাহ্নপাদের দোহা ও সরহপাদের দোহা) নেপালের রাজ গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কৃত হয়।

চর্যাপদ আবিষ্কার এর ৯ বছর পর ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বা বাংলা ১৩২৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে চর্যাপদ আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদনা করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

 

চর্যাপদ নামকরণ

নেপালের পুঁথিতে পদ গুলোর নাম দেওয়া হয়েছে “চর্যাচর্যবিনিশ্চয়” এবং টিকাকার মুনিদত্ত এই পদ সংগ্রহের নাম দেন “আশ্চর্যচর্যাচয়”

ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচী এই দুই নাম মিলিয়ে চর্যাপদের নাম “চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়” রাখার পরিকল্পনা করেন। অর্থাৎ-

চর্যাচর্য বিনিশ্চয় + আশ্চর্য চর্যাচয় = চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়

আধুনিক পণ্ডিতগণ এর মতে এর নাম “চর্যাগীতিকোষ”

-১৯২০ সালে চর্যাপদ এর ভাষা নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন বিজয়চন্দ্র মজুমদার।

-১৯২৬ সালে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর Origin & Development of the Bengali Language (ODBL) গ্রন্থে চর্যাপদের ভাষার তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন এবং প্রমাণ করেন যে চর্যাপদ আদি বাংলা ভাষায় রচিত।

-১৯২৭ সালে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদ এর ধর্মমত নিয়ে আলোচনা করেন।

-১৯৪৬ সালে ডক্টর শমীভূষণ দাশগুপ্ত চর্যাগীতির অন্তর্নিহিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেন।

-চর্যাপদ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন কীর্তিচন্দ্র এবং ১৯৩৮ সালে সেই তিব্বতি ভাষার অনুবাদ প্রকাশ করেন প্রবোধচন্দ্র বাগচী।

 

চর্যাপদের ভাষা

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার OBLD গ্রন্থে বলেছেন – “বাংলা নিশ্চয়ই; বাংলার প্রায় মূর্তি অবহটঠের সদ্যোনির্মোক মুক্ত রূপ।”

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন – “বঙ্গ কামরূপী”

-হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে – “আলো-আঁধারির ভাষা, সান্ধ্য ভাষা, সান্ধ্যা ভাষা”

ম্যাক্স মুলার এর মতে – “চর্যাপদের ভাষা হল প্রচ্ছন্ন ভাষা”

চর্যাপদ প্রাচীন বাংলা ভাষায় মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। চর্যাপদে হিন্দি, উড়িয়া, মোথিলী এবং অসমিয়া ভাষার মিশ্রণ লক্ষনীয়। অসমীয়া ও উড়িয়া ভাষা কে চর্যাপদ এর সহোদর ভাষা বলা হয়।

চর্যাপদের রচনাকাল (সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে)

শহীদুল্লাহ – ৬৫০ থেকে ১২০০

সুনীতিকুমার – ৯৫০ থেকে ১২০০


চর্যাপদের গুরুত্ব

ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাসের দিক থেকে চর্যাপদ এর গুরুত্ব অনেক। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গুরুপ্ত হলো-

১. চর্যাপদ বাংলা ভাষার একমাত্র লিখিত প্রাচীন নিদর্শন হওয়ায় এটি ছাড়া বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপের ধারণা পাওয়া যায় না।

২. চর্যাপদ বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।

৩. বিভিন্ন বাংলা শব্দের বিবর্তনের সূত্র এই চর্যাপদ থেকে বের করা যায়।

৪. বাংলা কবিতায় ছন্দ ও অন্তমিল চর্যাপদ দ্বারা প্রভাবিত হয়।

৫. চর্যাপদ এর কিছু কিছু প্রবাদ ও রূপকল্প বাংলা ভাষাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে।

বাংলা সাহিত্য তোমাকে যে আত্মিক শিক্ষা দিবে, পিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, হিসাববিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতি কখনোই তোমাকে সেই শিক্ষাটা দিতে পারবে না!
Emtiaz Khan (Founder | Crush School)

পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শত শত ভিডিও ক্লাস বিনামূল্যে করতে জয়েন করুন আমাদের Youtube চ্যানেলে-

www.youtube.com/c/crushschool

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool