সংস্কৃতি ও সভ্যতা (Culture and Civilization)

সংস্কৃতি

মানুষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীব। সংস্কৃতির অধিকারী হওয়ার জন্য মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। সাধারণত সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি মার্জিত রুচি বা অভ্যাসগত উৎকর্ষ। কিন্তু আসলে সংস্কৃতি বলতে আরও কিছু বোঝায়। মানুষের জীবনের সব দিকগুলোই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সংস্কৃতি হল মানুষের আচরণের সমষ্টি। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ সমাজ থেকে যা কিছু অর্জন করে তাই সংস্কৃতি। মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, আচার-ব্যবহার, ভাষা, খাওয়া-দাওয়া, নৈতিকতা, মূল্যবোধ সব কিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। ই.বি টেইলর (Tylor) বলেন যে, “সংস্কৃতি হচ্ছে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, নিয়ম, সংস্কার ও অন্যান্য দক্ষতা যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জন করে থাকে।” নর্থ (North) এর মতে, “কোনো সমাজের সদস্যরা বংশ-পরম্পরায় যেসব আচার, প্রথা ও অনুষ্ঠান উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে তাই সংস্কৃতি।”

 

সংস্কৃতির উপাদান

সংস্কৃতির উপাদানকে ২টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে যথা-

  • বস্তুগত উপাদান ও
  • অবস্তুগত উপাদান। 

সংস্কৃতির যে উপাদানটি বাস্তবরূপ ধারণ করে থাকে তাকে সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদান বলা হয়। যেমন- ঘরবাড়ি, কলকারখানা, টেবিল, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। অন্যদিকে সংস্কৃতির যে উপাদানটি উপলব্ধি বা অনুধাবন করা যায় তাকে অবস্তুগত উপাদান বলে। যথা- জ্ঞান, বিশ্বাস, নাটক, সাহিত্য, নৃত্যকলা, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি।

 

সভ্যতা

অনেক সমাজবিজ্ঞানী সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে এক করে দেখেন। কিন্তু সংস্কৃতি ও সভ্যতা এক জিনিস নয়। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ডন মার্টিন ডেল বলেন যে, উন্নত ধরনের শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ধর্ম-এরই সম্মিলিত অর্থে সভ্যতা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সভ্যতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ম্যাকাইভার ও পেজ বলেন, “সভ্যতা অর্থে আমরা বুঝি মানুষ তার জীবন ধারণের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে যান্ত্রিক ব্যবস্থা, কলাকৌশল ও সংগঠন সৃষ্টি করেছে, তারই সামগ্রিক রূপ।” সুতরাং সভ্যতা বলতে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে বোঝায় যার দ্বারা মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। অর্থাৎ নানা ধরনের কারিগরি কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতি সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত।

 

সংস্কৃতি ও সভ্যতার মাঝে সম্পর্ক

সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে সম্পর্ক জানতে হলে তাদের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে নিম্নলিখিত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়-

  • সংস্কৃতি হল মানুষের অবস্তুগত (Im-material) সৃষ্টি। যেমন- জ্ঞান, বিশ্বাস, সংগীত, নৃত্যকলা ইত্যাদি। এগুলো হল সংস্কৃতি। অন্যদিকে সভ্যতা হল মানুষের কর্তৃগত (Material) সৃষ্টি। যেমন- ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, ঘড়ি, টেলিভিশন, মোটরগাড়ি ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে ম্যাকাইভার বলেন, “আমরা “যা” সেটাই আমাদের সংস্কৃতি, আর আমাদের “যা আছে” বা আমরা “যা ব্যবহার করি” সেটাই হল সভ্যতা।” জার্মান দার্শনিক কান্ট (Kant) বলেন যে, সংস্কৃতি ব্যক্তির মনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, সভ্যতার সঙ্গে ব্যক্তির বাহ্যিক আচরণের সম্পর্ক।
  • দক্ষতার ভিত্তিতে সভ্যতার পরিমাপ করা যায়, কিন্তু সংস্কৃতির বিচার হয় মানুষের মানসিক উৎকর্ষের ভিত্তিতে। যেমন- একটি ট্রাক ঘোড়ার গাড়ির তুলনায় অধিক দ্রুতগামী, একটি উড়োজাহাজ ট্রাকের চেয়ে বেশি দ্রুতগামী। অন্যদিকে সংস্কৃতিকে কোনো কিছু দিয়ে বিচার করা যায় না। যেমন- একটি ভালো চিত্র কারোর কাছে সুন্দর, আবার কারোর কাছে অসুন্দর লাগতে পারে।
  • সভ্যতা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা যায়, কিন্তু সংস্কৃতি অর্জন করতে হয়। যেমন- উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো ব্যক্তি একটি হারমোনিয়াম পেতে পারে, কিন্তু ঐ হারমোনিয়াম বাজানোর কৌশল তাকে শিখতে হয়। 
  • সভ্যতার অবদানকে সহজেই উপলব্ধি করা যায়, কিন্তু সংস্কৃতির অবদান সাধারণ মানুষ অতি সহজেই উপলব্ধি করতে পারে না। সাধারণ লোক সামান্য শিক্ষা পেলেই আধুনিক যন্ত্রপাতির কলাকৌশল বা ব্যবহার বুঝে নিতে পারে। কিন্তু কোনো লোককে কবিতা লেখার নিয়ম শিখালেই যে সে ঐ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
  • সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু সংস্কৃতি সহজে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। যেমন- নর্ডিক জাতি রোমানদের পরাজিত করে রোমান সভ্যতা ধ্বংস করে দিয়েছিল, কিন্তু তারা রোমান ভাষা, আইন, প্রথা, ধর্ম প্রভৃতি সংস্কৃতির উপাদান ধ্বংস করতে পারে নি, বরং সেগুলো গ্রহণ করেছিল।
  • সভ্যতার গতি খুব দ্রুত, সংস্কৃতির গতি তেমন দ্রুত নয়।

সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। চারাগাছের বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য যেমন উপযুক্ত মাটি ও জলবায়ুর প্রয়োজন, তেমনি সংস্কৃতির বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দরকার। সভ্যতার বিভিন্ন উপাদান এ পরিবেশ সৃষ্টি করে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির যেমন উন্নতি সাধিত হয়, ঠিক তেমনি সভ্যতার অবদানকে উপেক্ষা করে সংস্কৃতি নিজেকে বিকশিত করতে পারে না। কাজেই সভ্যতাকে সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবে গণ্য করাই যুক্তিসঙ্গত।

পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শত শত ভিডিও ক্লাস বিনামূল্যে করতে জয়েন করুন আমাদের Youtube চ্যানেলে-

www.youtube.com/c/crushschool

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published.