Demo Post

নিউটনের কনাতত্ত্ব তখনকার সময় বেশ প্রভাব বিশ্তার করেছিলো কারন ত্রখনকার সময় যেমন আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং কে বড়সড় বিজ্ঞানী ভাবা হয়, তখনকার সময় নিউটনকেও তেমনি ভাবা হতো। কিন্তু নিউটনের কণাতত্ত্বে বাধ সাধলো ডাচ গণিতবিদ ত্রিশ্চিয়ান হাইগেন।

১৬৭৮ সালে হাইগেন বলেন যে আলো কণা না, বরং আলো হচ্ছে ত্রক ধরনের তরঙ্গ। কোনো আলোক উৎস থেকে আলো খুব ছোট ছোট তরঙ্গ আকারে ছরিয়ে পড়ে। ফ্রান্সিসকো মারিয়া গ্রিমান্ডি নামক ত্রক বিজ্ঞানী নিউটনের কণাতত্ত্ব আবিষ্কারের পর আলোর নতুন ত্রকটা ধর্ম বের করেন যার নাম অপবর্তন। গ্রিমান্ডিকে নিয়ে পরের আটিকেল গুলোতে কথা হবে। খুব সহজ ভাষায় আলোর অপবর্তন হচ্ছে আলো অত্যন্ত ছোট কোনো ছিদ্র (Hole) দিয়ে চলাচল করলে কিংবা কোনো অসচ্ছ মাধ্যম দারা বাধা পেলে আলো চারপাশে কিছুটা ছড়িয়ে পড়ে। যেমন আমরা যদি কোনো দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে ত্রক মগ পানি নিক্ষেপ করি তবে দেয়ালের অপর পাশে পানি সেই ছিদ্র দিয়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়বে। তবে আলো তখনি ছরাবে যখন ছিদ্র অনেক ছোট হবে।

যাই হোক, মারিয়া গ্রিমান্ডি দেখলেন যে আলোকে কণা হিসেবে ধরলে আলোর অপবর্তন ধর্মটা ব্যখ্যা করা যাচ্ছে না। তাই তিনি ভাবলেন আলো হয়ত কনা না, আলো হচ্ছে এক ধরনের তরঙ্গ। তিনি হাইগেনের সাথে ত্রকমত হলেন। তবে নিউটন তখন আলোর অপবর্তনের ঘটনাকে আলোর অন্য রকম প্রতিসরন বলে ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যাখ্যাটা দাড় করাতে পারেননি তিনি।

তরঙ্গকে নিজ চোখে দেখার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে পানিতে ডিল ছোড়া। যখন তুমি ঢেউহিন কোনো পুকুরের পানিতে ডিল ছুড়বে তখন দেখবে ডিল পুকুরে পড়ার সাথে সাথে ডিল পড়ার জায়গাটাকে ঘিরে একটা ছোট ঢেউ তৈরি হয়েছে।

ঢিল পুকুরের একদম মাঝখানে পড়লেও এই ছোট ডেউটা আস্তে আস্তে পুকুরের মাঝখান থেকে পারের দিকে চলে আসবে এবং পারে এসে মিলিয়ে যাবে। যখন ডিলটা পুকুরে পড়েছে তখন ডিলটি পানির কিছু কণাকে আঘাত করেছিলো এবং কম্পন তৈরি করেছিলো। পানির সেই কনাগুলো তার পাশের কনাগুলোকেও আঘাত করে এবং কম্পন তৈরি করে। এভাবে একটার পর একটা পানির কণা কম্পিত হতে থাকে এবং সেই কম্পন পারে এসে পৌচায়। এই ঘটনাটা হচ্ছে তরঙ্গ। তরঙ্গ হচ্ছে এক ধরনের শক্তি যেটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় কিন্তু মাধ্যমের কণাগুলোর অবস্থান পরিবতন করে না। এখানে ডিলের ফলে তৈরি হওয়া কম্পন শক্তি পুরো পুকুরে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এই ঘটনাটা হচ্ছে তরঙ্গ।

আমরা যে শব্দ শুনি সেটাও একটা তরঙ্গ যেটা বাতাস মাধ্যম দিয়ে ছরিয়ে পড়ে। দুটো বস্তুতে সংঘষ ঘটার পর বস্তু দুটির আশেপাশের বাতাসের কণাগুলো কেপে উঠে। এই কম্পন বাতাসের এক কনা থেকে আরেক কণায় ছড়িয়ে পড়ে এবং এভাবে আমাদের কানে বাতাসের কম্পনগুলো আঘাত করে। ফলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। তাই শব্দ একটা তরঙ্গ।

শব্দ তরঙ্গ চলাচল করার জন্য বাতাস মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আবার পানিতে ডিল ছুড়লে সেই তরঙ্গের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে পানি। কাজেই তরঙ্গ হচ্ছে একটা শক্তি যেটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

তরঙ্গ দুই ধরনের হয়। অনুদৈর্ঘ্য এবং অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ তৈরি হয় সংকোচণ এবং প্রসারন এর মাধ্যমে। একটা স্প্রিং-কে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের সবচেয়ে ভালো উদাহরন হিসেবে ধরা যায়।

আবার অনুপ্রস্থ তরঙ্গ তৈরি হয় তরঙ্গ শীর্ষ এবং তরঙ্গপাদ দিয়ে। একটা দড়িকে কোনো কিছুর সাথে বেঁধে আরেক প্রান্তে হাত দিয়ে জাকুনি দিলে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ তৈরি হয়।

হাইগেন আলোকে এই তরঙ্গের সাথে তুলনা করে। তার তত্ত অনুসারে আলো যখন তরঙ্গ আকারে চলা শুরু তখন কিছুক্ষণ পর সেই তরঙ্গ বড় হয়ে যায়, পানিতে তৈরি সেই ঢেউয়ের মত। তখন বড় হওয়া তরঙ্গের বাউন্ডারীর দিকে প্রতিটা কনা থেকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ তৈরি হয়। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ গুলো একই সাথে একই হারে বড় হওয়া শুরু করে। এভাবে একটা ক্ষুদ্র তরঙ্গ বড় হলে তার বাউন্ডারির প্রতিটা পয়েন্ট থেকে আবারো নতুন নতুন অনেক তরঙ্গ তৈরি হয়।

এখন আলো চলার পথে যদি একটা দেয়াল তুলে দেয়া হয়, সেই দেয়ালে যদি ছোট একটা পুটা করা হয়, তবে সেই পুটা দিয়ে আলো চলতে গিয়ে সেই জায়গাটায় আলোর তরঙ্গের প্রতিটা বিন্দু আবার ছোট ছোট নতুন অনেকগুলো তরঙ্গ তৈরি করবে। এই নতুন তরঙ্গগুলো পুটো অতিক্রম করার সময় দেয়ালের অপর পাশে ছড়িয়ে যাবে।

ব্যাপারটাকে আরেকটু সোজা ভাবে বোঝার জন্য ধরে নিলাম আমাদের দেয়ালের মাঝখানে একটা বড়সড় ফুটা আছে। যদি আমরা আলোকে এই পুটা দিয়ে নিক্ষেপ করি তবে আলো তেমন একটা ছরাবে না, পুটা দিয়ে সরলপথে চলে যাবে।

এবার দেয়ালের ফুটা যদি আরেকটু ছোট করি তাহলে আমাদের আলো একটু বেশি ছড়িয়ে পড়বে আগের তুলনায়। আরো ছোট ফুটা করলে আলো আরো বেশি ছড়াবে। অর্থাৎ ফুটা যত ছোট হবে আলো তত ছড়াবে। এটা হচ্ছে একটা তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য।

আলোকে তরঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করলে আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, অপবর্তন, ব্যাতিচার এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া যায়। কিন্তু কিছু জায়গায় আলোর তরঙ্গতত্ত অচল। সেগুলোর মধ্যে একটা গুরুপ্তপুর্ণ ঘটনা হলো তরঙ্গের পুনরায় মিলন।

একটা পুকুরে যদি ডিল ছোরার পর পানিতে তরঙ্গ তৈরি হয় এবং সেই তরঙ্গ পুকুরের পাড়ে এসে পৌছায়। ধরা যাক পুকুরের মধ্যে যেকোনো জায়গায় যদি একটা লাঠি পুতে রাখা হলো। তাহলে তরঙ্গ সেখানে বাধা পাবে এবং লাঠির পেছনের দিকে দুইপাশে ভাগ হয়ে যাবে। কিন্তু এই তরঙ্গ কিছুক্ষণ পর আবার মিলে যাবে লাঠির পেছনে।

আলো যেহেতু একটা তরঙ্গ তাই আলো কোনো লাঠি দ্বারা বাঁধা পাওয়ার পর লাঠির পেছনে তার মিলে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমন হয় না। লাঠির ওপর আলো ফেললে আমরা স্পষ্ট একটা ছায়া দেখতে পাই লাঠির পেছনে।

কাজেই এসব ঘটনা অনুযায়ী আলো তরঙ্গধর্মী হতে পারে না। আবার তরঙ্গ চলাচল করার জন্য মাধ্যম দরকার। কিন্তু আলো শুণ্য মাধ্যমেও চলে। আমাদের সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝখানে মহাকাশের অনেক জায়গাই হচ্ছে শুন্যস্থান। কিন্তু আলো কোনো মাধ্যম ছাড়াই বিভিন্ন নক্ষত্র কিংবা সূর্য থেকে এই শূন্যস্থান দিয়ে আমাদের পৃথিবীতে চলে আসে। একটা তরঙ্গ হিসেবে আলোর এই ধর্মও বেশ রহস্যজনক। তবে অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করতো আমাদের এই মহাবিশ্ব ইথার নামক একটা কল্পিত মাধ্যমের মধ্যে নিমজ্জিত অবস্থায় আছে। ফলে আলো এই ইথারকে ভর করে তরঙ্গ আকারে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তীতে ইথার নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ত প্রমান হয়নি। ইথারের অস্তিত্ত মিথ্যা প্রমাণের এই কাহিনী নিয়ে পরের কোনো এক অধ্যায়ে কথা বলবো।

জিওফ্রে টেইলর নামক আরেকজন বিজ্ঞানীর কথা বলা যায়। তিনি একই বর্নের আলো নিয়ে সেগুলোকে খুব কাছাকাছি অবস্থিত দুটো ছোট ছিদ্র দিয়ে চালনা করেন। যদি আলোর তিব্রতা বেশি হয় তবে ছিদ্র দিয়ে যাওয়ার পর আলো একে অপরের উপর উপরিপাতিত হয় এবং ব্যাতিচার সৃষ্টি হয়। এ থেকে আলোর তরঙ্গতত্ত প্রমানিত হয়। আবার তিনি আলোর তিব্রতা একদম কমিয়ে ফেলার পর দেখেন যে আলোকরশ্মি ছিদ্র দিয়ে যাওয়ার সময় ছোট ছোট বিক্ষিপ্ত কনায় পরিনত হয়। এটা আবার আলোর কণাতত্ত্বকে সমর্থন করে।

আবার নিউটনের দেয়া কণাতত্ত্ব আবিষ্কার হবার আগেও ড্যানিশ পদার্থবিদ বার্থলিন আরেকটা ঘটনা ঘটান। তিনি একটা লেখার উপর ক্যালাসাইট ক্রিস্টাল রেখে দেখেন যে সেই লেখাটার দুটো প্রতিসৃত ছবি দেখা যাচ্ছে। এই ঘটনাটাকে ডাবল রিফ্রাকশন (Double Refraction) বলে। কণা কিংবা তরঙ্গ কোনো তত্ত দিয়েই এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়নি।

তরঙ্গের একটা অক্ষমতা হচ্ছে এর শক্তি একটা সময় বাঁধা পেয়ে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তরঙ্গ সারাজীবন পথ চলতে পারে না। কিন্তু আলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। আলো চলার পথে বাঁধা না পেলে তার শক্তি নষ্ট হয়ে যায় না, সারাজীবন সেই আলো চলতে থাকে। যার প্রমাণ হচ্ছে আমাদের আকাশের বিভিন্ন তারা, নক্ষএ। মহাকাশের বেশিরভাগ তারার আলো আমাদের পৃথিবীতে পৌছাতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় নিয়েছে। কিন্তু আলো তরঙ্গধমি হলে কখনোই তারাদের আলো এত পথ পাড়ি দিয়ে পূথিবীতে আসতো না। তার আগেই আলোর তরঙ্গ শক্তি নষ্ট হয়ে যেতো। তাই এই ঘটনাটার ব্যখ্যা পাওয়া যায় না আলোকে তরঙ্গ হিসেবে ধরলে।

হাইগেনের তরঙ্গতত্ত্ব তখনকার সময় বেশি জনপ্রিয় হতে পারেনি। কারন তখন বিজ্ঞান মহলে রাজত্ত ছিলো নিউটনের। তাই কণাতত্ত্ব সহজেই মেনে নিয়েছিলো বেশিরভাগ মানুষ। তরঙ্গতত্ত্ব ছিলো ধোয়াশার মত অনিশ্চয়তায়। সেই অনিশ্চয়তা কাটাতে হাইগেনের প্রায় ১২৩ বছর পর থমাস ইয়ং নামক এক ব্যক্তি হাইগেনের তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য এগিয়ে আসেন। তার পরিক্ষাসহ প্রমানটাই পাল্টে দেয় পুরো আলোকবিজ্ঞানের জগত!