ফরাসি বিপ্লব (French Revolution)

ফরাসি বিপ্লব পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব কেননা এই ফরাসি বিপ্লব পৃথিবীর রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব প্রভাব রেখেছে। এই বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীতে ধন তান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা চালু হয়। ফ্রান্স হতে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শ অগ্রযাত্রা শুরু হয় এই ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমেই।

বিপ্লবের সময় তৎকালীন ফরাসি সমাজ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল-

  • যোজক শ্রেণী 
  • অভিজাত শ্রেণী
  • মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী (শ্রমিক, কৃষক ইত্যাদি)

উল্লেখ্য, যোজক শ্রেণী এবং অভিজাত শ্রেণী ছিল সুবিধাভোগীদের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তারা কোনো ধরনের সুবিধা ভোগ করতে পারত না। 

তৎকালীন সময়ে ফরাসি রাজারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করতেন। ফরাসি বিপ্লবের সময় তখনকার রাজা ছিলেন ষোড়শ লুই। তিনি বলেছিলেন “সার্বভৌম ক্ষমতা আমার উপরেই ন্যস্ত এবং সব আইন প্রণয়ন ক্ষমতাও আমার”।

তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বললেই তাদেরকে প্যারিসের বাস্তিল দুর্গতে (তৎকালীন সময়ের কারাগার, বর্তমান সময়ের জাদুঘর) বন্দি করে বর্বরতার সাথে হত্যা করা হতো। এমনও কথা শোনা যায়- যে একবার বাস্তিল দুর্গের প্রবেশ করতো সে আর কোনোদিনই জীবিত অবস্থায় সেই দুর্গ থেকে বের হতে পারতো না। সেটা ছিল সে সময় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য নরকের দরজা। ষোড়শ লুই ছিলেন সামন্তবাদে (Feudalism­) বিশ্বাসী। তার সাথে ধনীদের সম্পর্ক ছিল খুব ভালো, কিন্তু গরিবদের সাথে তিনি খুব খারাপ এবং বর্বর আচরণ করতেন।

ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ হলো-

তৎকালীন অর্থনীতিবিদদের নিষ্ক্রিয়তার ফলে রুটির মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার ফলে মানুষের পক্ষে সে রুটি কিনে খাওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। এছাড়া দুর্যোগের সময় খাবারের অভাব মানুষকে আরো বিদ্রোহী করে তোলে। তাই বলা যায় ফরাসি বিপ্লব সংগঠন হবার পিছনে অর্থনৈতিক কারণটা উল্লেখযোগ্য। 

ফরাসি বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পিছনে প্রধান কারণই হলো এটা। ১৭৭৬ সালে যখন আমেরিকা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করে তখন ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই সরাসরি আমেরিকাকে সমর্থন ও সাহায্য করতে থাকে।ক্রমাগত সাহায্য করার ফলে এক সময় ফ্রান্সের কোষাগার শূন্য হয়ে পরে। কিন্তু তখনো সে তার সাহায্যের হাত থামিয়ে দেয় নি, তিনি অর্থ সংগ্রহ করার জন্য ধনীদের ওপর উচ্চ করারোপ এর পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে শুরু উচ্চ করে সুদের প্রতিশ্রুতিতে।

রাজা সময় মতো ধনীদের তাদের ঋণ পরিশোধ করতে অপরাগ হয়। যার ফলে ধনীক শ্রেণীর রাজ্যের কিছু অংশ দাবি করে এবং রাজা সেগুলো দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন ধনিক শ্রেণীরা (রোবসপীয়র ধনীদের নেতৃত্বদানকারী) রাজার পতনের জন্য গরীবদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই তারা প্যারিসের বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটায়। এই বাস্তিল দুর্গের পতনের মাধ্যমেই ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। ঐদিন দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৯৮ জন বিদ্রোহী এবং ৮ রাজকীয় সিপাহী নিহত হয়।

ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব অথবা মৃত্যু। জ্যাঁ জ্যাক রুশো এই ফরাসি বিপ্লবের স্লোগান এর প্রবক্তা। তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন দার্শনিক যেমন- ভলতেয়ার, জ্যাক রুশো, মন্তেস্কু ইত্যাদি এরা ফরাসি বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান করছিলেন। ফরাসি বিপ্লবকে বুর্জোয়া বিপ্লবও বলা হয়।

১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি রাজা ষোড়শ লুই কে গিলোটিন দ্বারা সকলের সামনে শিরশ্ছেদ করে ধনীদের নেতৃত্বদানকারী রোবসপীয়র। তার মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ৩৬১ জন এবং বিপক্ষে ২৮৮ জন অবস্থান নিয়েছিলেন।

১৭৯৯ সালে যখন নেপোলিয়ন (ফরাসি নাবিক) নিজেকে সম্রাট বলে দাবি করে তখন ফরাসি বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে। নেপোলিয়ানকে বলা হত ফরাসি বিপ্লবের শিশু (বিপ্লব শুরু হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর এবং সম্রাট হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৩০ বছর)।

বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন ধরনের বই লিখে বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, জ্যাঁ জ্যাক রুশোর বিখ্যাত বই “The Social Contract“.

এছাড়া তার একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে-

"Man is born free, but is every where in chain"

ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তিতে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত হয় আইফেল টাওয়ার। যার অর্থায়নে ফ্রান্সকে সাহায্য করেছে আমেরিকা।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অতিথি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

S.M. Riazul Karim Shishir

Studying in the Department of Economics, Faculty of Social Science, Sheikh Hasina University. A Person Who Believes in Positive Thinking.