ম্যাক্সওয়েলের হারিয়ে যাওয়া ধারনা – Hidden Concept of Maxwell

ইয়ং এর বিখ্যাত ” Double Slit Experiment” দিয়ে প্রমাণ করা যায় আলো তরঙ্গধর্মী কিছু একটা! কিন্তু পৃথিবীতে শব্দ তরঙ্গ, পানির তরঙ্গ যাই থাকুক না কেনো সব তরঙ্গকে চলার জন্য একটা মাধ্যম দরকার। পৃথিবীতে আলোর তরঙ্গ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা বাতাসকে মাধ্যম হিসেবে ধরেন। কিন্তু সূর্যের আলো যখন মহাশূন্য (যেখানে বাতাস নেই) দিয়ে পৃথিবীতে আসে কিংবা বহু দূরের তারকাগুলোর আলো যখন মহাশূন্য দিয়ে পৃথিবীতে আসে তখন তাদেরকে বয়ে আনে কে? মহাশূন্যে তো বাতাস নেই! তাই নিশ্চয়ই মহাশূন্যে, মহাবিশ্বের প্রতিটা জায়গায় এমন কোনো মাধ্যম আছে যেটা আলোকে বয়ে বেড়ায়। কিছু বিজ্ঞানী (সবাই না) তাই মহাশূন্য সহ মহাবিশ্বের প্রতিটা জায়গায় একটা অদৃশ্য মাধ্যমের অস্তিত্বের কথা তুলে ধরেন। আর সেই অদৃশ্য মাধ্যমের নাম হচ্ছে ইথার। বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন আলো বহুদূর থেকে ইথার মাধ্যমে ভর করে চলাফেরা করে।

ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে। ইথারের ধারনাটা সবার প্রথমে এরিস্টটল বের করেছিলেন। তার এই ধারনা ইয়ং-এর ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্টের পর আবারো প্রাণ ফিরে পায়। এছাড়া লর্ড কেলভিন নামক আরেক বিজ্ঞানী ইথারকে বাতাসের চেয়েও অনেক বেশি হালকা বলে মনে করতেন। ইথারকে রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় ধরা হতো এবং তার ঘনত্ব অনেক বেশি ধরা হতো। তাই ইয়ং এর এক্সপেরিমেন্টের পর বিজ্ঞানীরা উঠেপড়ে লাগে এই এক্সপেরিমেন্টের মূল ভিত্তি ‘ইথার’-কে খুঁজে বের করার জন্য। ইথারকে বের করার আগে ইথার “যদি থেকেই থাকে” তাহলে আলোর জন্য কি কি সুবিধা এবং অসুবিধা হবে সেটা জেনে নেয়া দরকার।

রোমার, ফিজো, ফুকো, আলবার্ট মাইকেলসন ইত্যাদি বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা আলোর বেগ মেপেছিলেন। তাদের মাপা পরিমান থেকে দেখা যায় আলোর বেগ প্রচন্ড বেশি। কিন্তু কোনো কিছুকে মাপার জন্য সেটার একটা ভিত্তি দরকার, কাঠামো দরকার। যেমন কোনো রকেট যদি প্রচন্ড গতিতে ছোটে তবে তার গতিকে হিসাব করা হয় স্থির কোনোকিছুর সাপেক্ষে। আর চলন্ত রকেটের সাপেক্ষে আমাদের পৃথিবী স্থির। তাই এখানে রকেটের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থা হচ্ছে আমাদের কাঠামো বা ভিত্তি। এখন আলোর যে প্রচন্ড গতি সেটা কার সাপেক্ষে হিসাব করবো আমরা? বিজ্ঞানীরা ইথারকে সেই কাঠামো বা ভিত্তি হিসেবে ধরেন। অর্থাৎ ইথারের গতি হচ্ছে শূন্য, স্থির। স্থির ইথারে ভর করে আলো প্রচন্ড গতিতে তরঙ্গাকারে ছড়িয়ে পড়ে। এটা হচ্ছে ইথারের উপস্থিতির একটা সুবিধা।

কিন্তু ইথার যদি সত্যি সত্যি মহাবিশ্বে থাকে তবে আলোর কিছু ধর্মকে সেটা সমর্থন করে না। যেমন আমাদের পুকুরে ঢিল মারার কথাই ধরি। যখন পুকুরে ঢিল মারা হয় তখন প্রথমদিকে ঢিলের চারপাশে খুব শক্তিশালী তরঙ্গ তৈরি হয় এবং চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দুরত্ব যত বাড়তে থাকে পানিতে ঢেউও তত পাতলা হতে থাকে, অর্থাৎ তরঙ্গের শক্তি কমতে থাকে। পুকুরের পাড়ে এসে সেই তরঙ্গ একদম মিলিয়ে যায়। অর্থাৎ তরঙ্গের শক্তি শেষ হয়ে যায়।

আবার শব্দও এক ধরনের তরঙ্গ, আগেই বলেছিলাম। যখন আমরা কোনো আওয়াজ করি তখন সেটা কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না। তার আগেই বাতাস শব্দ তরঙ্গকে বাঁধা দিয়ে শব্দকে থামিয়ে দেয়। তাই আলো যদি তরঙ্গ হয়েই থাকে তবে বহুদূরে যেতে যেতে আলো ইথার মাধ্যম দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে থেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু আলো কখনো থামে না। যতক্ষন উৎস থাকে ততক্ষণ আলো দূর থেকে দূরান্তরে যেতে থাকে। ইথারের মাধ্যম দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্তও হয় না। তাই ইথারের উপস্থিতি আলোর এই ধর্মকে পুরোপুরিভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

আরেকটা ঝামেলার কথা বলি। শব্দ তরঙ্গ বাতাসে ভর করে চলাচল করে। ধরো তুমি কলেজে উঠেছো। তোমার নবীণবরণ অনুষ্ঠান হচ্ছে। এখন তোমার কলেজের মাঠে একটা মাইক থেকে স্যারদের ভাষণের শব্দ ভেসে আসছে তোমার কানে। তুমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছো, তোমার কানে ভাষণের শব্দের কোনো উঠানামা হচ্ছে না।

এবার ধরো তুমি একটা দৌড় দিলে ভাষণের মাইকের দিকে। তখন শব্দের তরঙ্গ তোমার দিকে যেমন ছুটে আসছে, তুমিও শব্দের দিকে ছুটে যাচ্ছো। তাই আগের চেয়ে তুমি বেশি জোরে শব্দ শুনতে থাকবে।আবার ধরো তুমি মাঠ থেকে দূরে দৌড় দিয়ে যাচ্ছো। ফলে মাইক থেকে তোমার দুরত্ব বাড়ছে, সেইসাথে শব্দ তরঙ্গের থেকেও তুমি দূরে সরে যাচ্ছো। ফলে আগের চেয়ে শব্দ আস্তে শুনতে থাকবে।

আলো যেহেতু তরঙ্গ তাই কোনো আলোক উৎসের দিকে যদি আমরা দৌড় দেই তবে আমাদের দিকে তাড়াতাড়ি আলোর ছুটে আসার কথা। তেমনিভাবে আমরা যদি আলোক উৎস থেকে দূরে দৌড়ে যাই তবে আলো আগের চেয়ে আস্তে আস্তে আমাদের দিকে ছুটে আসার কথা। কারন আলো ইথার মাধ্যমে ভর করে আসে। কিন্তু বাস্তবে এটা ঘটে না। আমরা স্থির কিংবা গতিশীল যে অবস্থাই থাকিনা কেনো, আলো সবসময় একই গতিতে আমাদের দিকে ছুটে আসে। শব্দের মত তার গতি বাড়েও না কমেও না।
যদি ইথার থেকেই থাকে তাহলে আলোর গতি সত্যি সত্যি বাড়া-কমা সম্ভব ছিলো। এই ধারণাটাই মনে ধরলো একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর। নাম ম্যাক্সওয়েল। তিনি মেনে নিলেন আমাদের পুরো মহাবিশ্ব ইথার নামক অদৃশ্য মাধ্যমে ঢুবে আছে। আমাদের পৃথিবী সূর্যের চারপাশে বৃত্তাকার পথে (পরবর্তীতে প্রমাণ হয় উপবৃত্তাকার পথে) ঘোরে। যেহেতু সূর্যের চারপাশে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসতে ১২ মাস লাগে পৃথিবীর, তাই প্রথম ৬ মাস পৃথিবী যেদিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘোরে, পরের ৬ মাস পৃথিবী তার বিপরীত দিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘোরে।

ফলে জানুয়ারি মাসে পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ছোটা শুরু করে ঠিক ৬ মাস পর জুলাই মাসে ১৮০ ডিগ্রি পথ ঘোরা শেষ করে। জুলাই মাস থেকে পৃথিবী আবারো সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরতে শুরু করে কিন্তু এবার পৃথিবী উল্টো দিকে ১৮০ ডিগ্রী ঘোরে। ঠিক ৬ মাস পর জানুয়ারি মাসে ১৮০ ডিগ্রী উল্টো দিকে ঘোরা শেষ হয় পৃথিবীর। এভাবে একবছর বা ১২ মাস সময়ে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে টোটাল ৩৬০ ডিগ্রী ঘোরে। এভাবে এপ্রিল মাসে পৃথিবী যেদিকে ছোটে, ৬ মাস পর অক্টোবর মাসে পৃথিবী ঠিক তার বিপরীত দিকে ছোটে।

তাই জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মাপা আলোর গতি এবং জুলাই মাসে একই জায়গা থেকে মাপা আলোর গতির মধ্যে পার্থক্য থাকার কথা। ম্যাক্সওয়েল এই গুরুপ্তপূর্ণ ধারণা নিয়ে বেশ উৎসাহী হয়ে উঠেন। তিনি রয়্যাল সোসাইটির জার্নাল ‘প্রসিডিং অব রয়্যাল সোসাইটি’র সম্পাদককে তার ধারনাটা জানান। কিন্তু সম্পাদক ম্যাক্সওয়েলের ধারণাকে পাত্তা দেননি। ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। আস্তে আস্তে ম্যাক্সওয়েলের ধারনাটা হারিয়ে যেতে থাকে।

ম্যাক্সওয়েলের হারিয়ে যাওয়া ধারনাটা হঠাৎ খুব মনে ধরে আলবার্ট মাইকেলসন নামক এক বিজ্ঞানীর। তিনিই প্রথম আমেরিকান বিজ্ঞানী যিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি আলোর বেগ বের করেন যেটা আগেকার বের করা আলোর বেগের তুলনায় ২০ গুন বেশি সঠিক ছিলো। মাইকেলসন ম্যাক্সওয়েলের হারিয়ে যাওয়া ধারণাকে একটু নিজের মত করে চিন্তা করলেন। আমরা তার এই চিন্তাকে একটা ট্রেনের উদাহরণ দিয়ে বুঝতে পারি।

ধরো ট্রেন স্টেশনে একটা ট্রেন স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে। সেখানে কোনো বাতাসের প্রবাহ নেই, সবকিছু একদম স্থির। তাই ট্রেনের পেছনে বাতাসের অবস্থা যেমন, সামনের দিকেও তেমন। হঠাৎ ট্রেন চলা শুরু করলো। প্রচন্ড গতি নিয়ে চলার সময় ট্রেন সামনের দিকের বাতাসকে ঠেলে এগিয়ে যাবে, কিন্তু পেছনের দিকের বাতাসকে ফেলে চলে যাবে। ফলে ট্রেনের পেছনের দিকে বাতাস প্রবাহিত হবে যার দিক হবে ট্রেন চলার বিপরীত দিকে। এজন্য ট্রেনের সামনে ১০ মিটার (ধরে নেই আমরা) দূরে একটা লোক এবং ট্রেনের পেছনে একই দূরত্বে (১০ মিটার) আরেকজন লোক দাড়িয়ে থাকলে ট্রেনটা হুইসেল দিলে ১০ মিটার সামনের লোকটা সেই হুইসেল আগে শুনবে। কিন্তু ১০ মিটার পেছনে দাঁড়ানো লোকটা হুইসেল শুনবে কিছু সময় পরে।

পৃথিবী যখন সূর্যের চারপাশে ঘোরে তখন তার গতিকে বার্ষিক গতি বলে। পৃথিবী সামনের দিকে যখন আগায় তখন সে মহাবিশ্বের ইথারকে ঠেলে সামনে এগিয়ে যায় (আমাদের ট্রেনের মত)। ঠিক তখন পৃথিবীর পেছনের দিকে তৈরি হয় ইথারের প্রবাহ, যার দিক হচ্ছে পৃথিবীর চলার উল্টো দিকে। যদি একটা আলোকে পৃথিবীর চলার পথের দিকে নিক্ষেপ করা হয় তবে সেটা ইথারে ভর করে দ্রুত সামনে আগাবে (ট্রেনের হুইসেলের শব্দের মত)। আবার সেই আলোকেই যদি পৃথিবীর চলার পথের পেছনের দিকে নিক্ষেপ করা হয় (যেখানে ইথারের প্রবাহ পৃথিবীর চলার পথের উল্টো দিকে) তবে আলোর কিছুটা সময় লাগবে “বিপরীত দিকে প্রবাহিত ইথারে” ভর করে চলতে।

মাইকেলসন আলোর এই চলার পথে কম-বেশি সময় লাগাকে প্রমাণ করার জন্য তার বিখ্যাত ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্র তৈরি করেন। কিন্তু তার পরিক্ষা থেকে তিনি দেখতে পান আলোর বেগ সবখানেই সমান, যেখান থেকেই মাপা হোক না কেনো। মাইকেলসনের ইন্টারফেরোমিটার দিয়ে করা পরিক্ষাটা ছিলো পৃথিবী থেকে বিভিন্ন দিকে নিক্ষেপ করা আলোর বেগের তারতম্য বের করার জন্য। কিন্তু তার এই পরিক্ষাটি ইথারের ধারণা পুরো পাল্টে দিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ম্যাক্সওয়েল তার এই পরিক্ষাটির কথা শুনে যেতে পারেননি। মারা যেতে হয়েছে তাকে বহু আগেই।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published.