হাবল টেলিস্কোপ (Hubble Telescope)

প্রথম মহাকাশে একটা রকেট দিয়ে টেলিস্কোপ প্রেরণের প্রস্তাব করেন জার্মান বিজ্ঞানী হারমান ওবার্থ (Hermann Oberth), ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে। এরই ধারাবাহিকতায় নাসার বিজ্ঞানীরা একটা বিশাল স্কুল বাসের সমান টেলিস্কোপ বানালেন, যার নাম ছিলো হাবল স্পেস টেলিস্কোপ, সংক্ষেপে HST. হাবল টেলিস্কোপের দৈর্ঘ্য ৪৩.৫ ফুট, ওজন ১১,১১০ কেজি, সর্বোচ্চ ব্যাস ১৪ ফুট। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডল পেরিয়ে মহাকাশে এই টেলিস্কোপটাকে স্থাপন করা।

হাবল টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয় বিজ্ঞানী এ্যাডউইন পি. হাব্‌ল-এর (১৮৮৯-১৯৫৩) নামানুসারে। তিনিই প্রথম মহাজাগতিক বস্তুসমূহের blue shift এবং red shift দেখিয়ে প্রমাণ করেন যে, এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল এবং প্রতিটি গ্যালাক্সি একটা আরেকটা থেকে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রমাণের উপর ভিত্তি করেই পরে মহাবিষ্ফোরণ তত্ত্বের সূচনা হয়।

১৯৯০ সালে একটা রকেটে করে হাবলের টেলিস্কোপটা বায়ুমন্ডলের বাইরে পাঠানো হয়। হাবল টেলিস্কোপ স্থাপনের জায়গাটা বায়ুমণ্ডলের বাইরে হলেও সেটা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের আয়ত্বের ভিতরে একটা নিরাপদ অঞ্চলে ছিলো, যার উচ্চতা ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫৯৬ কিলোমিটার উঁচু। সেখানে যেহেতু বাতাস নেই, তাই সেটির সাথে কোনো কিছু ঘর্ষণের চান্স নেই। তাই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের আয়ত্বের ভিতরে শূণ্যে ভেসে থাকে টেলিস্কোপটি। এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় পৃথিবী থেকে।

হাবল একটা প্রতিফলন টেলিস্কোপ (Reflecting Telescope), আয়নার প্রতিফলনে সে দূরবর্তি বস্তুর তথ্য নিতে পারে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাইতে এতে জোড়া হয় চন্দ্র এক্স-রে টেলিস্কোপ। চন্দ্র এর ক্ষমতা এতটাই ছিলো যে, দেড় মাইল দূর থেকে ওটা দিয়ে দেড় ইঞ্চির কোনো লেখা পড়া যেতো!

হাবল টেলিস্কোপ যেহেতু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে বসানো হয়নি, তাই এটি ঠিক চাঁদের মতোই পৃথিবী যেদিকে যায় (বার্ষিক গতি), পৃথিবীর সাথে সাথে সেদিকে যায়। তবে যেতে যেতে পৃথিবীকে চক্কর খায় বা পাক খায় (আহ্নিক গতি), যাতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে ভূমিতে পড়ে না গিয়ে নিজের অবস্থানে টিকে থাকতে পারে। প্রতি ৯৭ মিনিটে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ঘন্টায় ২৮,০০০ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীকে একবার ঘুরে আসে। এর যাবতীয় শক্তির প্রয়োজন সে সূর্যের আলো থেকে মেটায়। সৌরবিদ্যুৎ বানানোর জন্য এর মধ্যে ২৫ ফুট লম্বা দুটো সৌরপ্যানেল রয়েছে। বিদ্যুৎ শক্তি সঞ্চয়ের জন্য রয়েছে ৬টি নিকেল-হাইড্রোজেন ব্যাটারি, যেগুলো একত্রে ২০টা গাড়ির বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে পারে!

হাবল টেলিস্কোপ আল্ট্রাভায়োলেট থেকে ইনফ্রারেড পর্যন্ত (১১৫-২৫০০ ন্যানোমিটারে) আলোর সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যে দেখতে সক্ষম। এই বিশাল ক্ষমতা নিয়ে হাবল যা পর্যবেক্ষণ করে তার প্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে ১২০ গিগাবাইট তথ্য সে পৃথিবীতে পাঠায়। এতো এতো তথ্য সংরক্ষণে এই টেলিস্কোপে ম্যাগনেটো-অপটিক্যাল ডিস্ক ব্যবহৃত হয়।

নিচে হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে তোলা মহাকাশের একটা নেবুলার ছবি দেখানো হলো-

হাবল টেলিস্কোপ তার তোলা প্রথম ছবি পাঠায় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে, সেটা ছিল স্টার ক্লাস্টার NGC 3532’র একটা দৃশ্য। এখন পর্যন্ত এই টেলিস্কোপ লক্ষাধিক ছবি পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। আর সেসব ছবি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে মহাবিশ্বের বয়স, জানা গেছে ডার্ক এনার্জি বা কৃষ্ণশক্তি সম্বন্ধে। হাবলের চোখ দিয়ে বিজ্ঞানীরা একেকটা গ্যালাক্সির বিভিন্ন অবস্থা সম্বন্ধে জেনেছেন। হাবল টেলিস্কোপই প্রথম আবিষ্কার করে মহা শক্তিশালী গামা রে বার্স্ট বা গামারশ্মির বিষ্ফোরণ। এছাড়া এটি মহাকাশে গ্যাসের কিছু কুন্ডলি এমনভাবে আবিষ্কার করেছে, যেন তারা কিছু একটার ফাঁদে আটকা পড়েছে, যেটি ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এটি বৃহস্পতি’র উপগ্রহ ইউরোপার বাতাসে অক্সিজেনের উপস্থিতি সনাক্ত করেছে। এডউইন হাবল প্রমাণিত সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের মাত্রা আবিষ্কার করেছে হাবল টেলিস্কোপ।


এই টেলিস্কোপটি নাসা পাঠালেও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো বিজ্ঞানী হাবলকে ব্যবহারের অনুমতি চাইতে পারেন। অভিজ্ঞদের একটা প্যানেল তখন সেখান থেকে যোগ্যতম লোক বাছাই করে সেদিকে হাবলকে ঘুরিয়ে সেখানকার ছবি তুলে পাঠান সেই বিজ্ঞানীকে বা সেই বিজ্ঞান মহলকে। প্রতিবছর এরকম বহু আবেদন জমা পড়ে, তবে সেখান থেকে বছরে প্রায় ১,০০০ আবেদন যাচাই করে মাত্র ২০০ আবেদন মঞ্জুর করা হয়, আর সেই আবেদন অনুযায়ী কাজ করতে হাবলকে মোটামুটি ২০,০০০ একক পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অতিথি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

Emtiaz Khan

A person who believes in simplicity. He encourages the people for smart education. He loves to write, design, teach & research about unknown information.