নক্ষত্রের উপাদান শনাক্তকরণ (Identification of Star Elements)

প্রতিটা নক্ষত্র বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিয়ে গঠিত। এসব রাসায়নিক উপাদান গুলোর মধ্যে গ্যাসীয় উপাদান সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে। কিন্তু কোন নক্ষত্রে কি কি রাসায়নিক উপাদান রয়েছে সেটা দূর থেকে জানা একদমই সহজ না। সেটা জানতে হলে সেই নক্ষত্রে গিয়ে রিসার্চ করতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা একটা সুন্দর উপায় বের করেছেন যে পৃথিবীতে বসেই যেকোন নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন জানা যাবে। আর সেই উপায়টা হলো ‘বর্ণালীবীক্ষণ’ বা ‘Spectroscope’ নামে একটি যন্ত্রকে ব্যবহার করা।

একটি বস্তু কতটুকু আলো ছড়ায় এবং রঙিন হয় সেটা নির্ভর করে সে বস্তুর উত্তপ্তের পরিমানের উপর। বস্তু থেকে ছড়ানো আলোর এই বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে বস্তুর ভেতরের পদার্থের রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে জানাও সম্ভব। যেমন, একটি লোহার রডকে যদি ক্রমাগত গরম করা হয় দেখা যাবে এটি যত উত্তপ্ত হবে এটি থেকে তত বেশি আভা নির্গত হওয়া শুরু করবে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে লোহা থেকে যে আভা নির্গত হবে তার রঙও পরিবর্তন হবে। প্রথমে সেই আভার রঙ ইটের রঙ থেকে ক্রমে উজ্জ্বল লাল, তারপর গেরুয়া রঙ, এরপর লাল-সোনালি, সবশেষে হলুদ রঙের ছোপ পড়তে শুরু করবে। হলুদ রঙ উজ্জ্বলতর হতে হতে লোহার রডটা গলতে শুরু হওয়ার আগে নীলাভ সাদা রঙ এর রূপ নিবে। তাহলে বোঝা গেলো তাপমাত্রা পরিবর্তন হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে বস্তু থেকে নির্গত হওয়া আলোর রঙের পরিবর্তন ঘটে।

বিভিন্ন রঙ বৈচিত্র্যের সঙ্গে বিভিন্ন বস্তুর একটি পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে সর্বপ্রথম বের করেছিলেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ফটোবিশেষজ্ঞ থমাস ওয়েজউড। চীনামাটির বস্তুসামগ্রী তৈরি করার সময়ে এটা তিনি লক্ষ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে জার্মান পদার্থবিদ উইলহেম উইন প্রমাণ করে দেখান যে, ‘তাপ বিকিরণের বর্ণ বা রঙ হয় এর তাপমাত্রা অনুসারে অর্থাৎ কোনো বস্তুর তাপমাত্রা যত বাড়তে থাকে, বিকিরণের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য তত কমতে থাকে।’ এই সুত্রটিকে ‘উইনস ডিসপ্লেসমেন্ট ল’ বলা হয়। সূত্রটি আবিস্কারের জন্য তাকে ১৯১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এরপর আরো কিছু বিজ্ঞানীরা দেখান যে absolute 0ºC বা -273.16 ºC এর ওপরে যেকোনো বস্তুর তাপমাত্রা পৌঁছানো মাত্রই বস্তু বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির আলো ছড়াতে থাকে।

বর্ণালীবীক্ষণ বা Spectroscope গুলোকে বলা যায় এক প্রকার রংধনু তৈরি করার যন্ত্র। দূরবর্তী নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোক রশ্মি এর ভেতরে প্রবেশ করলে এটি ঐ আলোকে বিস্তৃত বর্ণালীতে রূপান্তর করে দেয়। অনেকটা প্রিজমের মাধ্যমে সাদা আলো থেকে সাত রংয়ের আলোতে বিশ্লিষ্ট হবার মতো। তবে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রটি নিউটনের প্রিজম থেকে আরো বেশি ক্ষমতার অধিকারী। এটি ব্যবহার করে অনেক দূরের নক্ষত্রের আলো নিয়ে সূক্ষ ও সঠিক পরিমাপ করা যায়। ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আসা আলো ভিন্ন ভিন্ন বর্ণালী তৈরি করে। বর্ণালীর এই বিষয়গুলো নক্ষত্র সম্পর্কে আমাদেরকে অনেক তথ্য প্রদান করে।

নক্ষত্র থেকে আগত আলো যখন বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বিশ্লিষ্ট হয় তখন বারকোডের (Barcode) মতো অনেকগুলো সরু কালো লাইন সৃষ্টি করে। এই আলোক বর্ণালী থেকে নক্ষত্রের বয়স, গঠন, উপাদান ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এমন না যে শুধুমাত্র দূরবর্তী নক্ষত্র থেকে আগত আলোক রশ্মিই বারকোড লাইন তৈরি করে, বিশেষ ক্ষেত্রে পৃথিবীতে উৎপন্ন আলোক রশ্মিও বারকোড লাইন তৈরি করতে পারে। সেই হিসেবে ল্যাবরেটরিতে এই আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে আমরা কোনো অজানা পদার্থের পরিচয়ও বের করতে পারি। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বিভিন্ন অজানা পদার্থের পরিচয় বের করা হয়। যেমন, সোডিয়াম থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন আলোর বর্ণালীতে হলুদ রং বেশি প্রকট আকারে থাকে। সেই কারণে সোডিয়ামের আলো হলদেটে হয়ে থাকে। এবার আমরা ৪টা মৌলের জন্য বর্ণালীর বারকোড দেখি-

উদাহরণ হিসেবে হাইড্রোজেন বর্ণালীর দিকে খেয়াল করি। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, হাইড্রোজেন চারটি রেখার সৃষ্টি করে। একটি বর্ণালীর বেগুনী অংশে, আরেকটি কালচে নীল অংশে, আরেকটি মলিন নীল অংশে এবং আরেকটি লাল অংশে। এভাবে প্রত্যেকটা মৌলের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় Dark line তৈরি হয়।

বর্ণালীবীক্ষণ দিয়ে পরীক্ষা করলে কোন ধরনের বর্ণালী পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে উৎস কোন অবস্থায় আছে কিংবা কিসের সাথে সংযুক্ত আছে তার উপর। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, নির্দিষ্ট কোনো মৌলের জন্য রেখাগুলো সবসময় একই অবস্থানে থাকে। রেখা রঙিন হোক আর কালো হোক, তার অবস্থান সবসময় বর্ণালীর একই অবস্থানে থাকে।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে বসে সকল মৌলের বর্ণালী রেকর্ড করে রেখেছেন। তাই দূর নক্ষত্র থেকে আসা আলোক রশ্মির বর্ণালী বিশ্লেষণ করে এবং পরে তা রেকর্ড থেকে মিলিয়ে নিয়ে তারা বলে দিতে পারেন, নক্ষত্রটি কোন কোন উপাদান দিয়ে তৈরি।

তবে আপাত দৃষ্টিতে এখানে কিছু সমস্যা হতে পারে। নক্ষত্র একাধিক মৌল দিয়ে গঠিত হতে পারে এবং এসব মৌল একসাথে তালগোল পাকিয়ে খিচুড়ি অবস্থা করে ফেলতে পারে। এমতাবস্থায় এদের থেকে আগত আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কিছু সমস্যা হবার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র বিশেষ উপায়ে এদেরকে আলাদা করে নিতে পারে।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অতিথি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

Emtiaz Khan

A person who believes in simplicity. He encourages the people for smart education. He loves to write, design, teach & research about unknown information.