সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপ (Landforms of the Seafloor)

ভূপৃষ্ঠের উপরের ভূমিরূপ যেমন উঁচু-নিচু তেমনি সমুদ্র তলদেশও অসমান। কারণ সমুদ্রতলে আগ্নেয়গিরি, শৈলশিরা, উচ্চভূমি ও গভীর খাত প্রভৃতি বিদ্যমান আছে। শব্দতরঙ্গের সাহায্যে সমুদ্রের গভীরতা মাপা হয়। এ শব্দতরঙ্গ প্রতি সেকেন্ডে পানির মধ্য দিয়ে প্রায় ১,৪৭৫ মিটার নিচে যায় এবং আবার ফিরে আসে। ফ্যাদোমিটার (Fathometer) যন্ত্রটি দিয়ে সমুদ্রের গভীরতা মাপা হয়। সমুদ্রের তলদেশের ভূমিরূপকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা হয়-

  • মহীসোপান (Continental shelf)
  • মহীঢাল (Continental slope)
  • গভীর সমুদ্রের সমভূমি (Deep sea plain)
  • নিমজ্জিত শৈলশিরা (Oceanic ridge)
  • গভীর সমুদ্রখাত (Oceanic trench)

 

মহীসোপান

  • পৃথিবীর মহাদেশসমূহের চারদিকে স্থলভাগের কিছু অংশ অল্প ঢালু হয়ে সমুদ্রের পানির মধ্যে নেমে গেছে। এরূপে সমুদ্রের উপকূলরেখা থেকে তলদেশ ক্রমনিম্ন নিমজ্জিত অংশকে মহীসোপান বলে।
  • মহীসোপানের সমুদ্রের পানির সর্বোচ্চ গভীরতা ২০০ মিটার।
  • এটি ০.১ ডিগ্রি কোণে সমুদ্র তলদেশে নিমজ্জিত থাকে।
  • মহীসোপানের গড় প্রশস্ততা ৭০ কিলোমিটার।
  • মহীসোপানের সবচেয়ে উপরের অংশকে উপকূলীয় ঢাল বলে।
  • মহীসোপানের বিস্তৃতি সর্বত্র সমান নয়। উপকূলভাগের উঁচু-নিচু হয়ে থাকার উপর এর বিস্তৃতি নির্ভর করে। উপকূল যদি বিস্তৃত সমভূমি হয়, তবে মহীসোপান অধিক প্রশস্ত হয়। মহাদেশের উপকূলে পর্বত বা মালভূমি থাকলে মহীসোপন সংকীর্ণ হয়।
  • ইউরোপের উত্তরে বিস্তীর্ণ সমভূমি থাকায় উত্তর মহাসাগরের মহীসোপান খুবই প্রশস্ত (প্রায় ১,২৮৭ কিলোমিটার)। তবে ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমে পৃথিবীর বৃহত্তম মহীসোপান অবস্থিত।
  • মহীসোপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম উত্তর অংশ উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে দেখতে পাওয়া যায় । অথচ এর পশ্চিমে উপকূল বরাবর উত্তর-দক্ষিণ ভঙ্গিল রকি পর্বত অবস্থান করায় সেখানে মহীসোপান খুবই সংকীর্ণ।
  • আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ স্থান মালভূমি বলে এর পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের মহীসোপান খুবই সরু। স্থলভাগের উপকূলীয় অঞ্চল নিমজ্জিত হওয়ার ফলে অথবা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার তারতম্য হওয়ার কারণে মহীসোপানের সৃষ্টি হয়। এছাড়া সমুদ্রতটে সমুদ্রতরঙ্গও ক্ষয়ক্রিয়ার দ্বারা মহীসোপান গঠনে সহায়তা করে থাকে।
  • ১৯৮২ সালের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী একটি উপকূলীয় রাষ্ট্রের মহীসোপানের সীমা হবে ভিত্তি রেখা হতে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল (৬৪৭.৫ কিমি.)।

 

মহীঢাল

  • মহীসোপানের শেষ সীমা থেকে ভূভাগ হঠাৎ খাড়াভাবে নেমে সমুদ্রের গভীর তলদেশের সঙ্গে মিশে যায়। এ ঢালু অংশকে মহীঢাল বলে।
  • সমুদ্রে এর গভীরতা ২০০ থেকে ৩,০০০ মিটার।
  • এটা অধিক খাড়া হওয়ার জন্য খুব প্রশস্ত নয়। এটি গড়ে প্রায় ১৬ থেকে ৩২ কিলোমিটার প্রশস্ত।
  • মহীঢালের উপরিভাগ সমান নয়। অসংখ্য আন্তঃসাগরীয় গিরিখাত অবস্থান করায় তা খুবই উঁচু-নিচু বা অমসৃণ প্রকৃতির। এর ঢাল মৃদু হলে জীবজন্তুর দেহাবশেষ, পলি প্রভৃতির অবক্ষেপণ দেখা যায় ৷

 

গভীর সমুদ্রের সমভূমি

  • মহীঢাল শেষ হওয়ার পর থেকে সমুদ্র তলদেশে যে বিস্তৃত সমভূমি দেখা যায় তাকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে।
  • এর গড় গভীরতা ৫,০০০ মিটার।
  • এ অঞ্চলটি সমভূমি নামে খ্যাত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা বন্ধুর বা অমসৃণ। কারণ গভীর সমুদ্রের সমভূমির উপর জলমগ্ন বহু শৈলশিরা ও উচ্চভূমি অবস্থান করে। আবার কোথাও রয়েছে নানা ধরনের আগ্নেয়গিরি। এ সমস্ত উচ্চভূমির কোনো কোনোটি আবার জলরাশির উপর দ্বীপরূপে অবস্থান করে।
  • সমুদ্রের এ গভীর অংশে পলি মাটি, সিন্ধুমল, আগ্নেয়গিরি থেকে উত্থিত লাভা ও সূক্ষ্ম ভস্ম প্রভৃতি জমা থাকে। এ সকল জমে থাকা পদার্থ স্তরে স্তরে জমা হয়ে পাললিক শিলার সৃষ্টি করে।

 

নিমজ্জিত শৈলশিরা

সমুদ্রের অভ্যস্তরে অনেকগুলো আগ্নেয়গিরি অবস্থান করছে। ঐসব আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা বেরিয়ে এসে সমুদ্রগর্ভে সঞ্চিত হয়ে শৈলশিরার ন্যায় ভূমিরূপ গঠন করেছে। এগুলোই নিমজ্জিত শৈলশিরা নামে পরিচিত। নিমজ্জিত শৈলশিরাগুলোর মধ্যে মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

 

গভীর সমুদ্রখাত

  • গভীর সমুদ্রের সমভূমি অঞ্চলের মাঝে মাঝে গভীর খাত দেখা যায়। এ সকল খাতকে গভীর সমুদ্রখাত বলে।
  • পাশাপাশি অবস্থিত মহাদেশীয় ও সামুদ্রিক প্লেট সংঘর্ষের ফলে সমুদ্রখাত প্লেট সীমানায় অবস্থিত।
  • এ প্লেট সীমানায় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি অধিক হয় বলেই এ সকল খাত সৃষ্টি হয়েছে। খাতগুলো অধিক প্রশস্ত না হলেও খাড়া ঢালবিশিষ্ট।
  • এদের গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,৪০০ মিটারের অধিক। প্রশান্ত মহাসাগরেই গভীর সমুদ্রখাতের সংখ্যা অধিক। এর অধিকাংশই পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত।
  • এ সকল গভীর সমুদ্রখাতের মধ্যে গুয়াম দ্বীপের ৩২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ম্যারিয়ানা খাত (Mariana trench) সবাপেক্ষা গভীর। এর গভীরতা প্রায় ১০,৮৭০ মিটার এবং এটাই পৃথিবীর গভীরতম খাত।
  • এছাড়া আটলান্টিক মহাসাগরের পোর্টোরিকো খাত (৮,৫৩৮ মিটার), ভারত মহাসাগরের শুন্ডা খাত প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শত শত ভিডিও ক্লাস বিনামূল্যে করতে জয়েন করুন আমাদের Youtube চ্যানেলে-

www.youtube.com/crushschool

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

Facebook Comments