সৌরজগৎ কাকে বলে (What is Solar System)

সৌরজগৎ কাকে বলে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে জানতে হবে সৌরজগতের গ্রহ গুলোর সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগে। সূর্য থেকে আমাদের এ পৃথিবী, গ্রহ ও উপগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। সূর্য সৌরজগতের প্রাণকেন্দ্র স্বরূপ। সূর্য ও তার গ্রহ, উপগ্রহ ও ধূমকেতু নিয়ে সৌরজগৎ গঠিত হয়েছে। সৌরজগতে ৯টি গ্রহ, ৪৯টি উপগ্রহ আছে। এছাড়া হাজার হাজার গ্রহাণুপুঞ্জ ও লক্ষ লক্ষ ধূমকেতু রয়েছে। গ্রহ ও উপগ্রহসমূহ সূর্য এবং নিজেদের পারস্পরিক মহাকর্ষণ শক্তির দ্বারা আকৃষ্ট হয়। ফলে তারা নির্দিষ্ট কক্ষপথে নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের চারদিকে পরিক্রমণ করছে। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান এই জ্যোতিষ্কমণ্ডলীকে সৌরজগৎ বলে।

সূর্য

সূর্য একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। পৃথিবীর সঙ্গে সূর্যের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কারণ সূর্য থেকেই পৃথিবীর উৎপত্তি। সূর্য পৃথিবী অপেক্ষা ১৩ লক্ষ গুণ বড়। পৃথিবী থেকে সূর্য প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এর ব্যাস প্রায় ১৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। সূর্যের উপরিভাগের উষ্ণতা ৫৭,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিরাট দূরত্বের জন্য সূর্যের অতি সামান্য তাপ পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এ সামান্য তাপ ও আলো দ্বারাই পৃথিবীর জীবজগতের সকল প্রয়োজন মিটে। সূর্যে কোনো কঠিন বা তরল পদার্থ নেই। শতকরা ৫৫ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ৪৪ ভাগ হিলিয়াম এবং শতকরা ১ ভাগ অন্যান্য গ্যাসে সূর্য গঠিত। সূর্যের মধ্যে মাঝে মাঝে যে কালো দাগ দেখা যায় তাকে সৌরকলঙ্ক বলে। পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সৌরকলঙ্কে উত্তাপ কিছু কম।

আণবিক শক্তি সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় সূর্যে অনবরত হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম এবং হিলিয়াম থেকে শক্তি তৈরি হচ্ছে। সূর্য প্রায় ২৫ দিনে নিজ অক্ষের (Axis) ওপর এক বার আবর্তন করে। সেইসাথে বৃহৎ বৃত্তাকার পথে প্রায় ২০ কোটি বছরের ব্যবধানে আপন গ্যালাক্সির চারদিকে পরিক্রমণ করে। তাই সৌরজগৎ কাকে বলে এই প্রশ্নের উত্তরটা আমরা শুরু করবো সূর্যকে দিয়ে।

সৌরজগতের গ্রহ সমূহ

সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা ৮টি। যথা- (১) বুধ, (২) শুক্র, (৩) পৃথিবী, (৪) মঙ্গল, (৫) বৃহস্পতি, (৬) শনি, (৭) ইউরেনাস, (৮) নেপচুন।

সূর্যের কাছের সৌরজগতের গ্রহ

বুধ (Mercury)

বুধ সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম এবং সূর্যের নিকটতম গ্রহ। এর ব্যাস ৪,৮৫০ কিলোমিটার এবং ওজন পৃথিবীর ৫০ ভাগের ৩ ভাগের সমান। সূর্যের চারদিকে পরিক্রমণ করতে এর ৮৮ দিন সময় লাগে। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব ৫.৮ কোটি কিলোমিটার। বুধের কোনো উপগ্রহ নেই। সূর্যের নিকটতম গ্রহ বলে এর তাপমাত্রা অত্যধিক।

শুক্র (Venus)

সৌরজগতের গ্রহ হিসেবে সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে শুক্রের অবস্থান দ্বিতীয়। সেইসাথে এটি পৃথিবীর নিকটতম গ্রহ। সূর্য থেকে শুক্র গ্রহের দূরত্ব ১০.৮ কোটি কিলোমিটার এবং পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪.৩ কোটি কিলোমিটার। একে সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে আমরা সন্ধ্যাতারা রূপে দেখি। আবার ভোরে পূর্ব আকাশে শুকতারা রূপে দেখতে পাই। সূর্যকে এক বার পরিক্রমণ করতে এর সময় লাগে ২২৫ দিন। শুক্রের কোনো উপগ্রহ নেই। পৃথিবীর মতো শুক্রের একটি বায়ুমণ্ডল রয়েছে কিন্তু এতে অক্সিজেন নেই। কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ প্রায় শতকরা ৯৬ ভাগ।

পৃথিবী (Earth)

পৃথিবী সূর্যের তৃতীয় নিকটতম গ্রহ। পৃথিবীর ক্ষেত্রফল ৫১০,১০০,৪২২ বর্গ কিলোমিটার । পূর্ব-পশ্চিমে এর ব্যাস ১২,৭৫২ কিলোমিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ১২,৭০৯ কিলোমিটার। সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব ১৫ কোটি কিলোমিটার। পৃথিবী ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে সূর্যকে এক বার প্রদক্ষিণ করে।

সৌরজগতের গ্রহ হিসেবে কেবল এ গ্রহে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন রয়েছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১৩.৯০° সেলসিয়াস। ভূত্বকে প্রয়োজনীয় পানি রয়েছে। গ্রহগুলোর মধ্যে একমাত্র পৃথিবীই জীবজন্তু ও উদ্ভিদের জীবন ধারণের জন্য আদর্শ গ্রহ।

চন্দ্র পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। পৃথিবী থেকে চন্দ্রের গড় দূরত্ব ৩,৮১,৫০০ কিলোমিটার। এটি ২৯ দিন ১২ ঘণ্টায় পৃথিবীকে এক বার পরিক্রমণ করে।

সৌরজগতের গ্রহ

মঙ্গল (Mars)

সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পৃথিবীর পরেই মঙ্গলের অবস্থান। সূর্য থেকে গড় দূরত্ব ২২.৮ কোটি কিলোমিটার এবং পৃথিবী থেকে ৭.৮ কোটি কিলোমিটার। মঙ্গল গ্রহের ব্যাস ৬,৭৮৭ কিলোমিটার এবং ওজন পৃথিবীর প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে মঙ্গল গ্রহের লাগে ৬৮৭ দিন। আবার নিজ অক্ষে এক বার আবর্তন করতে সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট। মঙ্গলের দুইটি উপগ্রহ আছে- ডিমোস ও ফেবোস। এখানে জীবন ধারণ অসম্ভব। বায়ুমণ্ডলে শতকরা ৩ ভাগ নাইট্রোজেন ও শতকরা ২ ভাগ আর্গন গ্যাস আছে। পানির পরিমাণ খুবই কম। পৃথিবীর তুলনায় অনেক ঠাণ্ডা, গড় উত্তাপ হিমাঙ্কের অনেক নিচে।

সূর্য থেকে দূরের গ্রহ

গ্রহাণুপুঞ্জ (Asteroids)

মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রহ একত্রে পুঞ্জীভূত হয়ে পরিক্রমণ করছে। এই পরিসরের মধ্যে আর কোনো গ্রহ নেই। ৮০৫ কিলোমিটার থেকে ১.৬ কিলোমিটার-এর কম ব্যাস সম্পন্ন এসব জ্যোতিষ্ককে গ্রহাণু বলে। একত্রিতভাবে এসব গ্রহাণুকে গ্রহাণুপুঞ্জ বলে।

বৃহস্পতি (Jupiter)

সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতি। সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহের অবস্থান পঞ্চম স্থানে। এর আয়তন পৃথিবীর প্রায় ১,৩০০ গুণ। এর ব্যাস ১,৪২,৮০০ কিলোমিটার। এটি সূর্য থেকে প্রায় ৭৭.৮ কোটি কিলোমিটার দূরে। বৃহস্পতি ১২ বছরে এক বার সূর্যকে এবং ৯ ঘণ্টা ৫৩ মিনিটে নিজ অক্ষে এক বার আবর্তন করে। এ গ্রহে গভীর বায়ুমণ্ডল আছে। এর ১৬টি উপগ্রহ রয়েছে। এদের মধ্যে লো, ইউরোপা, গ্যানিমেড ও ক্যালিস্টো প্রধান।

শনি (Saturn)

শনি সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ। সূর্য থেকে শনির দূরত্ব ১৪৩ কোটি কিলোমিটার। শনি ২৯ বছর ৫ মাসে সূর্যকে এক বার প্রদক্ষিণ করে। সেইসাথে এটি ১০ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে নিজ অক্ষে এক বার আবর্তন করে। শনি পৃথিবী থেকে প্রায় ৯ গুণ বড় এবং খালি চোখে এটি দেখা যায়। তিনটি উজ্জ্বল বলয় শনিকে বেষ্টন করে আছে। শনির ২২টি উপগ্রহের মধ্যে ক্যাপিটাস, টেথিস, হুয়া, টাইটান প্রধান।

ইউরেনাস (Uranus)

ইউরেনাস তৃতীয় বৃহত্তম গ্রহ। সূর্য থেকে এর দূরত্ব ২৮৭ কোটি কিলোমিটার। ৮৪ বছরে এটি সূর্যকে এক বার প্রদক্ষিণ করে। এর গড় ব্যাস প্রায় ৪৯,০০০ কিলোমিটার। এর আয়তন পৃথিবীর প্রায় ৬৪ গুণ এবং ওজন পৃথিবীর মাত্র ১৫ গুণ। এর ৫টি উপগ্রহ রয়েছে। ইউরেনাসেরও শনির মতো বলয় আবিষ্কৃত হয়েছে। মিরিস্তা, এরিয়েল, ওবেরন, অক্সিয়েল, টাইটানিয়া প্রভৃতি ইউরেনাসের উপগ্রহ।

নেপচুন (Neptune)

নেপচুনের গড় ব্যাস ৪৮,৪০০ কিলোমিটার এবং সূর্য থেকে দূরত্ব ৪৫০ কোটি কিলোমিটার। নেপচুন ১৬৫ বছরে সূর্যকে এক বার পরিক্রমণ করে। এর উপগ্রহ ২টি- ট্রাইটন ও নেরাইড। নেপচুন অত্যন্ত শীতল। সৌরজগতের গ্রহ হিসেবে এটি সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত। তাই কেউ যদি জিজ্ঞেস করে সৌরজগৎ কাকে বলে তখন আমরা এই জিনিসগুলো নিয়ে তার সামনে বর্ণনা করবো।

পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শত শত ভিডিও ক্লাস বিনামূল্যে করতে জয়েন করুন আমাদের Youtube চ্যানেলে-

www.youtube.com/c/CrushSchool

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool