পানির বৈশিষ্ট্য ও পানিবিদ্বেষী ধর্ম – Properties of Water & Hydrophobic Effect

জীবদেহে যত ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তার প্রত্যেকটা সাথে পানি (H2O) কোনো না কোনো ভাবে জড়িত। কেননা পানি হচ্ছে জীবদেহের সবচেয়ে ভালো দ্রাবক (Solution)। এছাড়া পানির উপস্থিতিতে জীবদেহের এসব রাসায়নিক বিক্রিয়া গুলো ঘটার নির্দিষ্ট পথ (Chemical Path) খুঁজে পায়। সেইসাথে একটা biological molecule বা জৈবঅণুর সর্বশেষ গঠন কেমন হবে সেটাও নির্ভর করে পানির ওপর। উদাহরণস্বরূপ আমাদের শরীরের কোষের মধ্যে থাকা প্রোটিনের bio synthesis ঘটে পানির জন্য, যার ফলে প্রোটিন গুলোর আকার হয় ত্রিমাত্রিক। আমরা এখানে পানির দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং effect নিয়ে কথা বলবো।

পানির একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি পোলার অনু নিয়ে গঠিত। আমাদের জানা আছে পানির অণুতে একটা কেন্দ্রীয় অক্সিজেন পরমাণু থাকে এবং তার পাশে দুটো হাইড্রোজেন পরমানু থাকে। অক্সিজেন এর সাথে যুক্ত হাইড্রোজেন পরমাণু নির্দিষ্ট কৌণিক দুরত্বে থাকে বলে পানির গঠন সরলরৈখিক বা Linear হয় না। এটির গঠন হয় ইংরেজি বর্ণমালা V আকৃতির।

পানির অণুর অক্সিজেনের তড়িৎ ঋণাত্মকতা হাইড্রোজেন এর চেয়েও বেশি। অক্সিজেন তার এই গুণকে কাজে লাগিয়ে হাইড্রোজেন এর সাথে তৈরি করা বন্ধন এর ইলেকট্রন দুটোকে নিজের দিকে টেনে নিতে চায়। ফলে অক্সিজেন এর মধ্যে অল্প কিছু পরিমাণ নেগেটিভ চার্জ তৈরি হয় এবং হাইড্রোজেন এর মধ্যে অল্প কিছু পরিমাণ পজিটিভ চার্জ তৈরি হয়। এই অল্প পরিমাণ চার্জকে Del চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়। নিচের ছবিতে দেখো-

যখন দুটো চার্জ একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে কাজ করে তখন সেখানে Electric Dipole Moment তৈরি হয়। যেহেতু পানির অণুতে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে কাজ করছে তাই এদের দুটো মেরু বা pole তৈরি হয়। সেজন্য পানির অণু হচ্ছে একটি পোলার অণু বা Polar Molecule.

পানির অন্য একটি ভালো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটির একটি অণু অন্যান্য পানির অণুর সাথে শক্তিশালী আন্তঃআণবিক বন্ধন তৈরি করে। এছাড়া অন্যান্য polar molecule গুলোর সাথেও পানি শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করতে পারে। পানির অণুতে অক্সিজেনের কাছে নেগেটিভ চার্জ এবং হাইড্রোজেন এর কাছে পজেটিভ চার্জ থাকে। যখন অনেক গুলো পানির অণু পাশাপাশি থাকে তখন অক্সিজেনের নেগেটিভ চার্জ অন্য পানির অণুর হাইড্রোজেনের পজেটিভ চার্জকে আকর্ষণ করে। একইভাবে হাইড্রোজেনের পজেটিভ চার্জ অপর একটা পানির অনুর অক্সিজেনের নেগেটিভ চার্জকে আকর্ষণ করে। এভাবে পানির অণুগুলো নিজেরা নিজেরা আকর্ষণ তৈরি করে যে বন্ধন তৈরি করে তাদেরকে Intermolecular Bond বা আন্তঃআণবিক বন্ধন বলে।

একটা হাইড্রোজেন পরমাণু যদি একটা তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলের সাথে বন্ধন তৈরি করে তবে তাকে হাইড্রোজেন বন্ধন বলে। হাইড্রোজেন বন্ধন বেশ শক্তিশালী কেননা প্রকৃতিতে হাইড্রোজেনের আকার খুব ছোট এবং এটি যখন কোনো তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলের সাথে যুক্ত হয় তখন H2 সেই মৌলের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। আবার দূরত্ব কমে গেলে দুটো মৌলের আকর্ষণ বাড়ে। কাজেই হাইড্রোজেন বন্ধন বেশ শক্তিশালী একটা বন্ধন। তাই একটা পানির অণুতে থাকা অক্সিজেনের সাথে অন্য অণুতে থাকা হাইড্রোজেন খুব দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে। হাইড্রোজেন বন্ধন এর মাধ্যমে পানির মধ্যে থাকা প্রতিটা পানির অণু একে অপরকে স্থির তড়িৎ বল বা Electric force দ্বারা আকর্ষণ করে।

পানির এই দুটো বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে পানির Hydrophobic বা হাইড্রোফোবিক ইফেক্টকে। হাইড্রোফোবিক ইফেক্ট বায়োকেমিস্ট্রিতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পানির মধ্যে যদি কোনো আয়নিক বন্ধন যুক্ত যৌগ যেমন সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) ইত্যাদিকে দেওয়া হয় তবে পানির শক্তিশালী হাইড্রোজেন বন্ধন সেই আয়নিক বন্ধন যুক্ত যৌগকে দ্রবীভূত করতে পারবে। সোডিয়াম এবং ক্লোরাইডের মধ্যকার যে আয়নিক বন্ধন আছে সেটাকে ভাঙ্গানোর জন্য পানির অনেকগুলো হাইড্রোজেন বন্ধন কাজ করে। সোডিয়াম এবং ক্লোরিনের আশেপাশে অনেকগুলো হাইড্রোজেন বন্ধন কিভাবে থাকে সেটা নিচে দেখানো হলো-

যেহেতু সোডিয়াম পজেটিভ চার্জ যুক্ত, তাই এর চারপাশে পানির অক্সিজেন পরমাণুগুলো যুক্ত থাকে। আবার ক্লোরিন নেগেটিভ চার্জযুক্ত তাই এর চারপাশে পানির হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত থাকে।

শুধু সোডিয়াম ক্লোরাইড না, অন্যান্য আয়নিক যৌগ গুলোকে যদি পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে পানির শক্তিশালী হাইড্রোজেন বন্ধন ওইসব যৌগগুলোকে পানিতে দ্রবীভূত করে দিবে। এক্ষেত্রে একটা কথা আছে যে Polar dissolves polar, অর্থাৎ পোলার যৌগ গুলো পোলার দ্রাবকে দ্রবীভূত হয় এবং অপোলার যৌগ গুলো পোলার দ্রাবকে দ্রবীভূত হয় না। এখানে পানির মধ্যে যেকোনো পোলার যৌগ গুলো দ্রবীভূত হয়। কিন্তু যদি পানির মধ্যে অপোলার যৌগকে ছেড়ে দেয়া হয় তবে কি ঘটবে?

যেহেতু অপোলার যৌগগুলোতে কোনো চার্জের প্রান্ত থাকে না তাই পানিতে এসব যৌগগুলো ভাঙ্গে না। অর্থাৎ পানির সাথে reaction করে না তারা। কিন্তু অপোলার যৌগের ১টা মাত্র অণু যখন পানিতে থাকে তখন পানির অণুগুলো সেই অণুর চারপাশে একটা বাউন্ডারি তৈরি করে। অর্থাৎ অপোলার অণুর চারপাশে একটা আবদ্ধ জায়গা বানিয়ে রাখে পানির অণুগুলো যাতে সেটি কোনো পানির অণুর সাথে বিক্রিয়া না করতে পারে। অর্থাৎ পানির হাইড্রোজেন বন্ধন এখানে অপোলার অণুর সাথে কোনো বন্ধন তৈরি করেনা। এই ঘটনাটি চিত্র-A তে দেখানো হয়েছে।

পানিতে যদি দুটো অপোলার অণু থাকে তবে তাদের চারপাশেও পানির অণুগুলো অবস্থান করে ঘিরে রাখে। কিন্তু অণু দুটো যখন কাছাকাছি আসে তখন তারা দুজনেই একে অপরের সাথে বন্ধন তৈরি করে, কারন দুজনেই যেহেতু অপোলার অণু। এক্ষেত্রে তাদের চারপাশে পানির অণুগুলো ঘিরে থাকে। কিন্তু দুটো অপোলার অণু আলাদাভাবে পানিতে থাকলে যে পরিমাণ পানির অণু তাদের ঘিরে থাকে, অপোলার অণু একত্রে বন্ধন গঠন করে থাকলে তারচেয়ে কম পরিমান পানির অণু তাদেরকে ঘিরে রাখে। চিত্র B তে দেখানো হয়েছে-

প্রথমে দুটো অপোলার অণু আলাদা থাকে বলে তাদের চারপাশে অনেকগুলো পানির অণু আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। কিন্তু পরেরবার যখন অপোলার অণু দুটো একত্রে বন্ধন তৈরি করে তখন তাদের চারপাশে আগের তুলনায় কম পরিমান পানির অণু আবদ্ধ হয়ে থাকে।

অপোলার অণু এবং পানির অণুর এই ধরনের interaction কে Hydrophobic Effect বলে। যদি অনেকগুলো অপোলার অণুকে পানিতে ছেড়ে দেয়া হয় তবে তারা একে অপরের কাছে আসার চেষ্টা করে এবং নিজেদের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে একত্রে অবস্থান করে। সবশেষে তাদের বাইরের দিকে পানির অণুগুলো ঘিরে রাখে। এভাবে পানির সাথে এসব অপোলার যৌগ কোনো রকম reaction করেনা। শুধুমাত্র একত্রিত হয়ে থাকে।

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

অতিথি লেখক হিসেবে আমাদেরকে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে মেইল করুন-

write@thecrushschool.com

Emtiaz Khan

A person who believes in simplicity. He encourages the people for smart education. He loves to write, design, teach & research about unknown information.

Facebook Comments