আধুনিক যুগে ভৌত বিজ্ঞানের বিকাশ (The development of Physics in the Modern Era)

কোপারনিকাস যে সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের ধারণা উপস্থিত করেন কেপলার সেই ধারণার সাধারণ গাণিতিক বর্ণনা দেন তিনটি সূত্রের সাহায্যে। কেপলারের সাফল্যের মূল ভিত্তি হল, তিনি প্রচলিত বৃত্তাকার কক্ষপথের পরিবর্তে উপবৃত্তকার কক্ষপথ কল্পনা করলেন। গ্রহদের গতিপথ সম্পর্কে তাঁর গাণিতিক সূত্রগুলোর সত্যতা তিনি যাচাই করলেন গ্রহদের গতিপথ সম্পর্কে তাঁর গুরু টাইকোব্রাহের পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যের দ্বারা। কেপলারের গাণিতিক সূত্রগুলো পরিমাণগতভাবে গ্রহদের গতিপথ নির্ধারণ করলেও তা ছিল নিছক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যকে সমীকরণের মধ্যে ধারণ করার ব্যাপার।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম সূচনা ঘটে ইটালির বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর অবদানের ভিতর দিয়ে। তিনি প্রথম দেখান যে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে ভৌত রাশির সংজ্ঞার্থ ও এদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ বৈজ্ঞানিক কর্মের মূল ভিত্তি। তিনিই অ্যারিস্টটলের ‘কেন?’ প্রশ্নের পরিবর্তে ‘কেমন করে?” এই প্রশ্নের প্রবর্তন করেন। গ্যালিলিওর মৃত্যুর বছরেই নিউটনের জন্ম। গ্যালিলিও’র উদ্ভাবিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে পূর্ণতর রূপ প্রদান করেন নিউটন। গাণিতিক তত্ত্ব নির্মাণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে সে তত্ত্বের সত্যতা যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক যে ধারা তা প্রতিষ্ঠিত হয় নিউটনের বিস্ময়কর প্রতিভার দ্বারা। গ্যালিলিও সরণ, গতি, ত্বরণ, সময় ইত্যাদির সংজ্ঞা ও এদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করেন। ফলে তিনি বস্তুর পতনের নিয়ম আবিষ্কার ও সৃতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেন। নিউটন আবিষ্কার করেন বলবিদ্যা ও বলবিদ্যার বিখ্যাত তিনটি সূত্র। আলোকবিদ্যায়ও তাঁর অবদান রয়েছে। গণিতের নতুন শাখা ক্যালকুলাসও তাঁর আবিষ্কার।

গ্রহদের গতিপথ সম্পর্কে কেপলারের সূত্রগুলোর মূল উৎসরূপে মহাকর্ষের তত্ত্ব তিনি আবিষ্কার করেন। নিউটনের অবদান এতই গভীর ও সুদূরপ্রসারী যে সনাতনী পদার্থবিজ্ঞানকে নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞান বলা হয়।

 

বিজ্ঞান ও শিল্পবিপ্লব

অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বৃটেনের শিল্প ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংঘটিত হয়। এই অপূর্ব পরিবর্তনকে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব নামে অভিহিত করা হয়। এই বিপ্লবে শিল্প উৎপাদনের কাঠামো, কলাকৌশল ও উৎপাদন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। কারিগরি ক্ষেত্রে নাটকীয় উন্নতি শিল্প বিপ্লবের অন্যতম কারণ। শিল্প বিপ্লবের আগে থেকেই ইংল্যান্ড জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইউরোপে নেতৃত্বের আসনে আসীন ছিল। ১৬৬০ সালে রয়েল একাডেমী প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের লোকের মধ্যে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক মানসিকতার জন্ম হয়। নিউটনের মত বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ বিষয়ের সাহায্যে বিভিন্ন কারিগরি উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার ঘটে। বৈজ্ঞানিক আবিস্কার উৎপাদনের কলাকৌশলকে উন্নত ও কারিগরি জ্ঞানকে বিকশিত করে। জেমস্ ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন শিল্প বিপ্লবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যানবাহনে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের সংযুক্তি যাতায়াত ও চলাচল ব্যবস্থায় অকক্মণীয় গতি সঞ্চার করে। ফলে মালামাল সর্বত্র দ্রুত বণ্টন সম্ভব হওয়ায় জিনিসপত্রের চাহিদা ও বিক্রি বেড়ে যায় অনেকগুণ। চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে শিল্পোদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন নতুন আবিষ্কারও ত্বরান্বিত হয়। এ সময়ে ধাতু গলানোর চুল্লি আবিষ্কার হওয়ায় লোহা ও ইস্পাত শিল্পের অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়। তদুপরি বস্ত্রশিল্পে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি আবিষ্কার, কয়লা শিল্পের প্রসেসিং ইত্যাদি শিল্প বিপ্লবকে উৎসাহিত ও অগ্রগামী করে তোলে। যন্ত্রপাতি ও কৌশলগত আবিষ্কারের ফলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই লাভ পুন: বিনিয়োগ করে ইংল্যান্ডের পক্ষে দ্রুত শিল্পায়ন করা সম্ভব হয়। শিল্পোন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য শিল্পপণ্ডিতরা বিজ্ঞান সাধনার পিছনেও বিনিয়োগে উৎসাহী হন, ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশ ও গতি লাভ করে।

উনিশ শতকের আবিষ্কার ও উদ্ভাবন ইউরোপকে শিল্প বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরষ্টেড (Hans Chiristian Oersted ১৭৭৭ – ১৮৫১) দেখান যে, তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ক্রিয়া আছে। এই আবিষ্কার মাইকেল ফ্যারাডে (Michael Faraday, ১৭৯১ – ১৮৬৭), হেনরী (Henry, ১৭৯৭ – ১৮৭৯) ও লেন্জ (Lenz, ১৮০৪ – ১৮৬৫) কে পরিচালিত করে চৌম্বক ক্রিয়া তড়িৎপ্রবাহ উৎপাদন করে এই ঘটনা আবিষ্কারের দিকে। আসলে এটি হল যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আবিষ্কার। আমাদের অধিকাংশ তড়িৎ সম্বন্ধীয় শিল্পের ভিত্তি হল এ আবিষ্কার।

১৮৬৪ সালের মহান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (James Clerk Maxwell, ১৮৩১ – ১৮৭১) আলোর তড়িৎ চুম্বকীয় তত্ত্বের বিকাশ ঘটান। ১৮৮৮ সালে হেনরিখ হার্জও (Heinrich Hertz, ১৮৫৭ – ১৮৯৪) এ রকম বিকিরণ উৎপাদন ও উদঘাটন করেন। ১৮৯৬ সালে মার্কনী (Marconi) এরকম তরঙ্গ ব্যবহার করে অধিক দূরত্বে মোর্সকোডে সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেন। এভাবে বেতার যোগাযোগ জন্ম লাভ করে। এ শতকের শেষের দিকে রনজেন (Roentgen, ১৯৫৪ – ১৯২৩) এক্স-রে এবং বেকেরেল (H. Becquerel, ১৮৫২-১৯০৮) ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন।

বিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটে। এ মত প্রকাশ করা হয়ে থাকে যে ১৯০০ সাল থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে যে পরিমাণ অগ্রগতি হয়েছে তা অতীতের সব অগ্রগতির পরিমাণকে ছাড়িয়ে গেছে। বিকিরণ বিষয়ক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের (Max Planck, ১৮৫৮ – ১৯৪৭) কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও আলবার্ট আইনস্টাইনের (Albert Einstein, ১৮৭১ – ১৯৫৫) আপেক্ষিক তত্ত্ব পূর্বের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলকেই শুধু ব্যাখ্যা করেনি, এমন ভবিষ্যৎ বাণীও সম্ভব হয়েছে যা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের (Ernest Rutherford, ১৮৭১ – ১৯৩৭) পরমাণু বিষয়ক নিউক্লিয় তত্ত্ব ও নীলস্ বোরের হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন স্তরের ধারণা পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভবত প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। এ শতকে পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের যে উন্নতি হয়েছিল তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর।

পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ঘটে ১৯৩৮ সালে। এই সময় অটো হান (Otto Hann, ১৮৭৯-১৯৬৮) ও স্ট্রেসম্যান (Strassmann, ১৯০২) বের করেন যে পরমাণু ফিশনযোগ্য। ফিশনের ফলে একটি বড় আকারের পরমাণু ভেঙে দুটি মাঝারি আকারের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয় এবং পরমাণুর ভরের একটি অংশ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, জন্ম হয় পারমাণবিক বোমার। বর্তমানে পরমাণু থেকে যে শক্তি আমরা পাচ্ছি তা অতীতের সমস্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত শক্তির তুলনায় বিপুল। শক্তির এ বিপুল উৎস মানুষের কল্যাণ না ধ্বংসে ব্যবহৃত হবে তা নির্ভর করে বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের নিয়ন্ত্রণে যারা আছেন তাঁদের ওপর।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে পদার্থবিজ্ঞানের রয়েছে অভূতপূর্ব অবদান। তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আবিষ্কারেও পদার্থবিজ্ঞান অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে বিকাশ লাভ করেছে পরমাণু তত্ত্ব, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

বিংশ শতাব্দীতে আকাশ ভ্রমণ, মহাশূন্যে ভ্রমণ, পারমাণবিক শক্তি, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদির বিপুল উন্নতি সাধিত হয়। নতুন নতুন ওষুধ যেমন পেনিসিলিন, অ্যান্টিবায়োটিকস আবিষ্কৃত হয়। ম্যালেরিয়া, পোলিও, যক্ষ্মা প্রভৃতি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। আকাশ ভ্রমণের জন্য নতুন ও দ্রুতগামী এরোপ্লেন আবিষ্কৃত হয়। মহাশূন্য সম্পর্কে বিভিন্ন জ্ঞান আহরণের জন্য মানুষ মহাশূন্যে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করে। চাঁদের মাটিতে মানুষের পদার্পণ ঘটে, মঙ্গল গ্রহে রকেট ছোটে। কৃত্রিম উপগ্রহ আবহাওয়ার পূর্বাভাসদানে কিংবা যোগাযোগকে সহজ করতে চমৎকার অবদান রাখছে।

নিউক্লিয় বা পারমাণবিক শক্তি অতিদ্রুত বিকাশ লাভ করে এবং শক্তির একটি প্রধান উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও কম্পিউটার মানুষের ক্ষমতাকে অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের জীবন যাত্রাকে আরও সহজ, আরও সুন্দর এবং উপভোগ্য করার জন্য বহু ব্যবস্থা বিজ্ঞান করেছে।

বিংশ শতাব্দীতে আমাদের বাংলাদেশের কয়েকজন বিজ্ঞানী বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অবদান রেখে দুনিয়ায় পরিচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, কুদরাত-ই-খুদা প্রমুখ বিজ্ঞানী উল্লেখযোগ্য।

পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শত শত ভিডিও ক্লাস বিনামূল্যে করতে জয়েন করুন আমাদের Youtube চ্যানেলে-

www.youtube.com/crushschool

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool