জীবজগতের আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস (The Modern Taxonomy of the Living World)

কোষ, এমনকি এর অঙ্গাণুর গঠন ও জীববিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার আধুনিক তথ্য ব্যবহার করে তৈরি শ্রেণীবিন্যাসকেই আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস বলা যায়।

থিয়োফ্রাস্টাস, লিনিয়াস বা বেথাম-হুকার-এর শ্রেণীবিন্যাসে ব্যাকটেরিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবকে (micro organisms) অন্তর্ভুক্ত করে পরে একাধিক শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। Whittaker একটি ফাইভ-কিংডম (five kingdom) পদ্ধতি প্রস্তাব করেন ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। তিনি সব কোষীয় জীবকে Monera, Protista, Plantae, Fungi এবং Animalia এই পাঁচটি কিংডমে বিভক্ত করেন। পরবর্তীকালে Dr. Lynn Margulis ১৯৭৪ সালে Whittaker-এর শ্রেণীবিন্যাসকে পরিবর্তিত ও বিস্তারিত করেন। Five Kingdom, Symbiotic Planet তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বই। ড. লিন মারগুলিস একজন জীববিজ্ঞানী যিনি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটিতে জিওসায়েন্স (Geosciences) বিষয়ের প্রফেসর হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তিনি আমেরিকার সর্বোচ্চ বিজ্ঞানীর জাতীয় পদক প্রাপ্ত ।

 

Margulis-এর ফাইভ কিংডম শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি

Margulis জীবজগতকে দুটি সুপার কিংডম এবং পাঁচটি কিংডম-এ বিভক্ত করেন।

সুপার কিংডম – ১

প্রোক্যারিওটা (Prokaryota) : এদের নিউক্লিয়াস সুগঠিত নয় অর্থাৎ এরা আদিকেন্দ্রিক (প্রাককেন্দ্রিক), এককোষী ও আণুবীক্ষণিক।

কিংডম : মনেরা (Monera)

বৈশিষ্ট্য :

  • এরা এককোষী, ফিলামেন্টাস (শরীর সূতার মত), কলোনিয়্যাল (দলবদ্ধভাবে থাকে) বা মাইসেলিয়্যাল (জালিকার মত শরীর)।
  • কোষে নিউক্লিয়ার বস্তু আছে কিন্তু নিউক্লিওলাস এবং নিউক্লিয়ার মেমব্রেন নেই।
  • ক্রোমাটিন বডিতে DNA আছে, কিন্তু প্রোটিন নেই।
  • এদের কোষে প্লাস্টিড, মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা ইত্যাদি নেই।
  • এদের কোষ বিভাজন অ্যামাইটোসিস প্রক্রিয়ায় হয়।
  • কোষপ্রাচীর পলিস্যাকারাইড ও আমিষ দিয়ে তৈরি।
  • এদের অধিকাংশই শোষণ (absorption) প্রক্রিয়ায় খাদ্যগ্রহণ করে থাকে, তবে কিছু ফটোসিনথেটিক প্রক্রিয়ায় এবং কিছু কেমোসিনথেটিক প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে থাকে।
  • বংশবৃদ্ধি প্রধানত দ্বিভাজন পদ্ধতিতে ঘটে। দ্বিভাজন মানে যে প্রক্রিয়ায় একটি ব্যাক্টেরিয়া কোষ সরাসরি দু’ভাগে ভাগ হয়ে একটি হতে দুটিতে পরিণত হয়।
  • এদের রিকমবিনেশন একমুখী (unidirectional) বা ভাইরাল নিয়ন্ত্রিত।

সব ধরনের ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া, প্রোক্লোরোফাইটা, রিকেটসী, মিকসোব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি সব প্রাককেন্দ্রিক জীবকে এ কিংডমে জায়গা দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ : Bacillus albus, Escherichia coli, Nostoc linckia.

সুপার কিংডম – ২

ইউক্যারিওটা (Eukaryota) : এদের নিউক্লিয়াস সুগঠিত অর্থাৎ এরা সুকেন্দ্রিক, এককোষী থেকে বহুকোষী, একক বা কলোনি আকারে দলবদ্ধ জীবনযাপন করে।

কিংডম – ১ : প্রোটকটিস্টা (Protoctista)

বৈশিষ্ট্য :

  • এরা এককোষী একক, এককোষী কলোনিয়্যাল বা বহুকোষী এবং সুকেন্দ্রিক।
  • কোষের নিউক্লিয়ার বস্তু নিউক্লিয়ার মেমব্রেন দিয়ে ঘিরে থাকে।
  • ক্রোমাটিন বডিতে (chromatin body) DNA, RNA এবং প্রোটিন আছে। 
  • এদের কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া, প্লাস্টিড, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা ইত্যাদি পাওয়া যায়।
  • ফটোসিনথেটিক পিগমেন্ট যদি থাকে তাহলে তা ক্লোরোপ্লাস্টে অবস্থান করে।
  • খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি শোষণ (absorption), গ্ৰহণ (ingestion) বা সালোকসংশ্লেষণমূলক (Photosynthetic) হয়ে থাকে।
  • এদের দেহে ভ্রূণ (embryo) সৃষ্টি হয় না।
  • মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে অযৌন প্রজনন ঘটে।
  • কনজুগেশনের মাধ্যমে যৌন প্রজনন ঘটে।
  • এদের অধিকাংশই জলজ (aquatic)।

বিভিন্ন ধরনের অ্যামিবা, বিভিন্ন ধরনের শৈবাল, স্লাইম মোল্ড (slime mold), ওয়াটার মোল্ড (water mold), কাইট্রিডস (chytrids) ইত্যাদি জীবকে এ কিংডমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। Oomycota ছত্রাক প্রোটকটিস্টা কিংডম এর অন্তর্ভুক্ত।

উদাহরণ : Spirogyra hyalina, Amoeba proteus, Saprolegnia parasitica.

কিংডম – ২ : ফানজাই (Fungi)

বৈশিষ্ট্য :

  • এরা মৃতজীবী বা পরজীবীরূপে বাস করে। অধিকাংশই বহুকোষী ও স্থলজ, অল্পকিছু সংখ্যক জলজ পরিবেশে জন্মায়।
  • মাইসেলিয়্যাল অথবা পরবর্তী পরিবর্তনে এককোষী (secondarily unicellular)।
  • এদের কোষপ্রাচীর কাইটিন দিয়ে গঠিত এবং সঞ্চিত খাদ্য গ্লাইকোজেন।
  • খাদ্যগ্রহণ শোষণ (absorption) পদ্ধতিতে হয়।
  • দেহ সাধারণত শাখাযুক্ত, ফিলামেন্ট সিনোসাইটিক (coenocytic), যাতে ছিদ্রযুক্ত প্রস্থপ্রাচীর সৃষ্টি হতে পারে।
  • হ্যাপ্লয়েড স্পোরের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে। অর্থাৎ কনিডিয়া, ব্যাসিডিয়োস্পোর ইত্যাদি দিয়ে বংশবৃদ্ধি ঘটে।
  • জাইগোটে মায়োসিস হয়।
  • এরা সুকেন্দ্রিক বা প্রকৃত কোষী।
  • এদের কোন ফটোসিনথেটিক পিগমেন্ট নেই।
  • নিষেকের পর জাইগোটে মায়োসিস ঘটে।
  • এদের পরিবহনতন্ত্র নেই।
  • এদের জননাঙ্গ এককোষী।
  • স্ত্রীজননাঙ্গে থাকা অবস্থায় জাইগোট বহুকোষী ভূণে পরিণত হয় না।

কিংডম ফানজাইকে পাঁচটি ফাইলামে- Zygomycota, Ascomycota, Basidiomycota, Deuteromycota এবং Mycophycophyta ভাগ করা হয়েছে।

উদাহরণ: Penicillium notatum, Agaricus campestris, Mucor indicus.

কিংডম – ৩ : প্ল্যান্টি (Plantae)

বৈশিষ্ট্য :

  • এরা সুকেন্দ্রিক, বহুকোষী ও ষভোজী সবুজ উদ্ভিদ। ক্লোরোফিল ‘এ’ এবং ক্লোরোফিল ‘বি’ প্রধান ফটোসিনথেটিক পিগমেন্ট।
  • কোষপ্রাচীর সেলুলোজ নির্মিত এবং কোষে প্রায়ই বৃহদাকার গহ্বর থাকে।
  • উন্নত টিশ্যুবিন্যাস থাকে।
  • ভ্ৰূণ সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে ডিপ্লয়েড পর্যায়ের শুরু হয়।
  • এরা মূলত স্থলজ। কিন্তু জলজ প্রজাতিও অনেক আছে।
  • এদের যৌন জনন অ্যানাইসোগ্যামাস (anisogamous) বা উগ্যামাস (Oogamous) প্রকৃতির। 
  • এরা আর্কিগোনিয়েটস্ (archegoniates) এবং পুষ্পক উদ্ভিদ (flowering plants)।

প্ল্যান্টিকে দুটি গ্রেড-এ ভাগ করা হয়েছে-

গ্রেড – ১ : ব্রায়োফাইটা (Bryophyta)

উদ্ভিদ গ্যামিটোফাইটিক এবং এদের পরিবহনতন্ত্র নেই।

উদাহরণ: Riccia gangetica, Semibarbula orientalis.

গ্রেড – ২ : ট্রাকিওফাইটা (Tracheophyta)

উদ্ভিদ স্পোরোফাইটিক এবং এদের পরিবহনতন্ত্র আছে।

ব্রায়োফাইটা গ্রেডে ১টি ফাইলাম ও ৩টি ক্লাস আছে-

ফাইলাম -১ : ব্রায়োফাইটা

ক্লাস – ১ : অ্যানথোসিরোটি (Anthocerotae)

ক্লাস – ২ : হেপাটিকি (Hepaticae)

ক্লাস – ৩ : মাসাই (Musci)

ট্রাকিওফাইটা গ্রেডে রাখা হয়েছে-

১। ফার্নজাতীয় উদ্ভিদ। যেমন- Pteris longifolia

২। নগ্নবীজী উদ্ভিদ। যেমন- Cycas pectinata

৩। আবৃতবীজী উদ্ভিদ। যেমন- Artocarpus heterophyllus (কাঁঠাল)। 

ট্রাকিওফাইটাতে ৮টি ফাইলাম আছে-

ফাইলাম-১ : লাইকোপোডোফাইটা (Lycopodophyta),

ফাইলাম-২ : স্ফেনোফাইটা (Sphenophyta)

ফাইলাম-৩ : ফিলিসিনোফাইটা (Filicinophyta)

ফাইলাম-8 : গিংগোফাইটা (Ginkgophyta)

ফাইলাম-৫ : কনিফেরোফাইটা (Coniferophyta)

ফাইলাম-৬ : নিটোফাইটা (Gnetophyta)

ফাইলাম-৭ : সাইকাডোফাইটা (Cycadophyta)

ফাইলাম-৮ : অ্যানজিওস্পার্মোফাইটা (Angiospermophyta)

অ্যানজিওস্পার্মোফাইটা ফাইলামে ২টি ক্লাস আছে-

ক্লাস-১ : Magnoliatae (দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ)

ক্লাস-২: Liliatae (একবীজপত্রী উদ্ভিদ)

কিংডম – ৪: অ্যানিম্যালিয়া (Animalia)

বৈশিষ্ট্য :

  • এরা সুকেন্দ্রিক ও বহুকোষী জীব এবং সাধারণত হলোজয়িক (holozoic) জৈব পদার্থ আহার করে।
  • এরা ভিন্নভোজী স্বভাবের।
  • এদের কোষে কোন জড় কোষপ্রাচীর, প্লাস্টিড ও বৃহদাকার গহ্বর নেই।
  • এদের দেহে ক্লোরোফিল নেই। তাই খাদ্যের জন্য এরা পরনির্ভর। প্রধান খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি গলাধঃকরণ (ingestion)।
  • প্রধানত যৌন জনন প্রক্রিয়ায় এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে। ডিপ্লয়েড স্ত্রী-পুরুষ থেকে হ্যাপ্লয়েড গ্যামিট সৃষ্টি হয়।
  • ভ্রূণ বিকাশকালে উল্লেখযোগ্য হারে টিশ্যুর অভিপ্রয়াণ (migration) এবং পুনর্বিন্যাস ঘটে।

একে ৩২টি ফাইলাম, বহু সাব-ফাইলাম ও বহু ক্লাসে ভাগ করা হয়েছে।

উদাহরণ: Homo sapiens (মানুষ), Bufo melanostictus (কুনো ব্যাঙ)।

পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শত শত ভিডিও ক্লাস বিনামূল্যে করতে জয়েন করুন আমাদের Youtube চ্যানেলে-

www.youtube.com/crushschool

ক্রাশ স্কুলের নোট গুলো পেতে চাইলে জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে-

www.facebook.com/groups/mycrushschool

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published.